ইউসিবিসহ আরও ৬ ব্রোকারেজ হাউস পাচ্ছে কমোডিটির লাইসেন্স
শেয়ার বিজ
দেশে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন এই বাজার চালুর প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকার প্রস্তুতের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সদস্যভুক্ত সাতটি ব্রোকারেজ হাউস কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকারের লাইসেন্সের জন্য কমিশনে আবেদন করেছে। নির্ধারিত যোগ্যতা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পর্যালোচনা করে প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ, বি-রিচ, সোহেল সিকিউরিটিজ, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ, রয়েল ক্যাপিটাল, ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ এবং ন্যাশনাল লাইফ সিকিউরিটিজ। এসব প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাচাই-বাছাই করে যোগ্যতা পূরণকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এর বাইরে আরও কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউস কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকারের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য আবেদনকারীদের মধ্যে পিএসপি স্টক অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ওয়ান লিমিটেড এবং রেমনস ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকারের লাইসেন্স প্রচলিত পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ লাইসেন্সের মতো নয়। নতুন এই বাজারে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা সনদ বা লাইসেন্স নিতে হবে। নির্ধারিত বিধিমালায় থাকা যোগ্যতা পূরণ করতে পারলে ভবিষ্যতে অন্যান্য ব্রোকারেজ হাউসও এই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য বা স্টেকহোল্ডার হওয়ার পাশাপাশি কমিশনের নির্ধারিত অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে হবে। ফলে বিদ্যমান ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেটে লেনদেনের সুযোগ পাবে না। তাদের জন্য আলাদাভাবে সক্ষমতা, অবকাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড পূরণের প্রয়োজন হবে।
নতুন এই বাজারে ব্রোকারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং এক্সচেঞ্জের মধ্যে লেনদেন সম্কাদন, অর্ডার ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রোকাররাই প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে। তাই বাজার চালুর আগে পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ ও প্রস্তুত ব্রোকার তৈরি করাকে জরুরি মনে করছে কমিশন।
কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর ক্ষেত্রে শুরুতেই বড় পরিসরে বিভিন্ন পণ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা নেই। প্রাথমিক পর্যায়ে গোল্ড ও সিলভার দিয়ে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজারের কার্যক্রম, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অংশগ্রহণকারীদের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে অন্যান্য কমোডিটি যুক্ত করা হবে।
পরবর্তী সময়ে কপার, কটন এবং ক্রুড পাম অয়েল বা সিপিওর মতো পণ্য ডেরিভেটিভস মার্কেটে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক লেনদেন রয়েছে এবং দামের ওঠানামার কারণে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের মূল্যঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়।
বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক ও বড় ব্যবসায়ীদের জন্য কমোডিটির দাম ভবিষ্যতে কত হবে, তা আগাম জানা সম্ভব নয়। ফলে পণ্যের দামের বড় ধরনের পরিবর্তন ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ডেরিভেটিভস মার্কেট সেই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে।
তবে বাজার চালুর প্রথম ধাপেই ফিজিক্যাল ডেলিভারি থাকছে না। অর্থাৎ চুক্তি শেষে সংশ্লিষ্ট পণ্য বাস্তবে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা শুরুতে থাকবে না। প্রথম ধাপে ক্যাশ সেটেলমেন্ট কন্ট্রাক্ট চালু করা হবে।
ক্যাশ সেটেলমেন্টের ক্ষেত্রে কোনো কমোডিটি চুক্তির মেয়াদ শেষে পণ্য সরবরাহ না করে চুক্তির মূল্য এবং নির্ধারিত নিষ্কত্তিমূল্যের পার্থক্য নগদ অর্থে সমন্বয় করা হয়। ফলে বাজার চালুর প্রাথমিক পর্যায়ে পণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন, সরবরাহ এবং ডেলিভারি ব্যবস্থাপনার জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।
এ পদ্ধতিতে বাজার পরিচালনার জন্য মূলত প্রয়োজন হবে কার্যকর ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, ম্যাচিং সিস্টেম, ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কাঠামো। এসব অবকাঠামো ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগও তৈরি হবে।
পরবর্তী সময়ে ফিজিক্যাল ডেলিভারি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য নির্ধারিত মানের পণ্য সংরক্ষণের জন্য অনুমোদিত ওয়্যারহাউস তৈরি বা নির্বাচন করতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যের মান, বিশুদ্ধতা ও নির্ধারিত স্কেসিফিকেশন যাচাইয়ের জন্য অ্যাসেয়িং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ফিজিক্যাল ডেলিভারি চালু হলে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেটের সঙ্গে বাস্তব পণ্যবাজারের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। তবে এর জন্য শুধু এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারের অবকাঠামো যথেষ্ট নয়; ওয়্যারহাউস, পরিবহন, মান যাচাই, বীমা, নিরাপত্তা এবং পণ্য হস্তান্তরসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে। কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেটকে শুধু জল্পনাভিত্তিক বা স্কেকুলেটিভ বাজার হিসেবে গড়ে তুলতে চায় না বিএসইসি। বরং মূল্যঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বা হেজিংয়ের একটি কার্যকর বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কমোডিটির দাম আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নানা কারণে দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো ব্যবসায়ী ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট দামে পণ্য কিনবেন বা বিক্রি করবেন—এমন পরিস্থিতিতে বাজারদর পরিবর্তিত হলে তার লাভ বা ক্ষতির পরিমাণও বদলে যেতে পারে।
ডেরিভেটিভস চুক্তির মাধ্যমে সেই ঝুঁকির একটি অংশ আগেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সহজভাবে বললে, একজন ব্যবসায়ী যদি আশঙ্কা করেন যে ভবিষ্যতে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, তাহলে তিনি আগাম একটি নির্দিষ্ট দামে চুক্তি করে ভবিষ্যতের মূল্যঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করতে পারেন। আবার কোনো উৎপাদক বা বিক্রেতা ভবিষ্যতে পণ্যের দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে একইভাবে ডেরিভেটিভস ব্যবহার করে ঝুঁকি কমাতে পারেন। এক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য অতিরিক্ত মুনাফা করা নয়; বরং পণ্যের দামের অনিশ্চয়তা থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা।
কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেটে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, বড় কমোডিটি ট্রেডার, প্রস্তুতকারক এবং রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে হেজার হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার সঙ্গে কমোডিটির দাম সরাসরি যুক্ত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য পরিবর্তন হলে তাদের ব্যবসায়িক ব্যয় ও আয় উভয়ই প্রভাবিত হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করবে। কিন্তু চুক্তির সময় থেকে পণ্য হাতে পাওয়ার সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ডেরিভেটিভস কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
একইভাবে কোনো রপ্তানিকারক ভবিষ্যতে পণ্য বিক্রি করবেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলে তার প্রত্যাশিত আয় কমতে পারে। ডেরিভেটিভসের মাধ্যমে সেই মূল্যঝুঁকির বিরুদ্ধেও সুরক্ষা নেওয়া সম্ভব।
এই ধরনের বাস্তব ব্যবসায়িক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করেই দেশের কমোডিটি ডেরিভেটিভস হেজিং কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজন মার্কেটকে গড়ে তুলতে চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, দেশে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যোগ্যতা পূরণকারী সাতটি ব্রোকারকে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শুরুতে গোল্ড ও সিলভার নিয়ে ক্যাশ সেটেলমেন্ট কন্ট্রাক্ট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিশেষ করে অনুমোদিত ওয়্যারহাউস এবং পণ্যের মান ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের অ্যাসেয়িং ব্যবস্থা প্রস্তুত হলে ফিজিক্যাল ডেলিভারি চালু করা হবে।
হেজিং কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজন থাকা হেজারদের তুলনামূলক বেশি পজিশন লিমিট দেওয়ার উদ্যোগ থাকবে বলে জানা গেছে।
কারণ একজন বড় আমদানিকারক বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কমোডিটি এক্সপোজার অনেক বেশি হতে পারে। তার ঝুঁকির পরিমাণ যদি বড় হয়, তাহলে খুব কম পজিশন লিমিট দিয়ে তাকে কার্যকরভাবে হেজিংয়ের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে না।
তাই প্রকৃত ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং ডেরিভেটিভস পজিশনের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত জল্পনা, কৃত্রিম মূল্যপ্রভাব এবং অস্বাভাবিক পজিশন তৈরির ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফলে হেজারদের জন্য তুলনামূলক বেশি সীমা থাকলেও তা যথাযথ যাচাই ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় থাকবে।
দেশে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর উদ্যোগ নতুন নয়। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আটকে ছিল। অবশেষে ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চূড়ান্ত নিবন্ধন পায়।
ভারতের মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (এমসিএক্স) এবং পাকিস্তান মার্চেন্টাইল এক্সচেঞ্জের (পিএমইএক্স) অভিজ্ঞতায় অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রস্তুতি, বিধিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি এবং বাজারের অংশগ্রহণকারীদের প্রস্তুত করার পর এখন সেটি বাস্তব লেনদেনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হলে দেশের পুঁজিবাজারের পরিধিও বাড়বে। এতদিন মূলত শেয়ার ও অন্যান্য আর্থিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল বাজারে কমোডিটি ডেরিভেটিভস যুক্ত হলে নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হবে।
কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সিএসই আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচিং, অর্ডার এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্থাপন করেছে।
কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেটে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ বিভিন্ন ধরনের কন্ট্রাক্ট, মূল্য, মেয়াদ, পজিশন এবং ঝুঁকি একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে হয়। দ্রুত অর্ডার গ্রহণ ও ম্যাচিংয়ের পাশাপাশি প্রতিটি অবস্থানের ঝুঁকি নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় মার্জিন ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
সিএসইর মূল সিস্টেম স্থাপনে শ্রীলঙ্কাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় একটি ভেন্ডরের ডেরিভেটিভস সফটওয়্যার যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এক্সচেঞ্জের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক সফটওয়্যারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হচ্ছে।
বাজার চালুর আগে শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করাই নয়, দক্ষ মানবসম্কদ তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত দুই বছরে প্রায় ২০০ ট্রেডারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ১৫টি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানকে কমোডিটি ডেরিভেটিভস কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
নতুন বাজারে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রচলিত পুঁজিবাজারের শেয়ার লেনদেনের সঙ্গে কমোডিটি ডেরিভেটিভসের কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে। এখানে ফিউচার বা অন্যান্য ডেরিভেটিভস কন্ট্রাক্ট, মার্জিন, পজিশন লিমিট, মার্কেট-টু-মার্কেট, ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় রয়েছে।
ফলে ব্রোকার, ট্রেডার এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীকে এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বাস্তব প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ইতোমধ্যে যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হয়েছে, তা বাজার চালুর প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্টরা। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রযুক্তি অবকাঠামো, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ, মানবসম্কদ উন্নয়ন এবং বাজার পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে প্রকল্পের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে। তবে বাজারের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করতে সামনে আরও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
বিশেষ করে ফিজিক্যাল ডেলিভারি চালুর আগে অনুমোদিত ওয়্যারহাউস, পণ্যের মান যাচাইয়ের অ্যাসেয়িং ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট লজিস্টিক অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ক্যাশ সেটেলমেন্টের মাধ্যমে বাজার পরিচালনাকেই প্রাথমিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নতুন এই বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য তৈরি করা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পর্যাপ্ত ক্রেতা-বিক্রেতা এবং হেজার অংশগ্রহণ না থাকলে বাজারে লেনদেনের গভীরতা কম থাকতে পারে। এ ছাড়া প্রকৃত ব্যবসায়িক হেজারদের বাজারে আনা, ব্রোকারদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং বাজারে কারসাজির সুযোগ বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে কমোডিটি ডেরিভেটিভস মার্কেট যাতে অতিরিক্ত স্কেকুলেশনের কেন্দ্রে পরিণত না হয়, সেদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নজর রাখতে হবে। একই সঙ্গে হেজিংয়ের নামে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই বিএসইসি প্রথম ধাপে সাতটি ব্রোকারকে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে। এর মাধ্যমে বাজার চালুর জন্য প্রয়োজনীয় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হবে।
পরবর্তী সময়ে বাজারের আকার, লেনদেনের পরিমাণ এবং অংশগ্রহণকারীদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আরও ব্রোকারকে লাইসেন্স দেওয়া হতে পারে। ফলে এখনকার সাত প্রতিষ্ঠানকে বাজারের প্রাথমিক পর্যায়ের অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখা হলেও ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রথমে সীমিতসংখ্যক ব্রোকার, সীমিতসংখ্যক কমোডিটি এবং ক্যাশ সেটেলমেন্টের মাধ্যমে বাজার চালু করে ধীরে ধীরে পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরে অবকাঠামো প্রস্তুত হলে ফিজিক্যাল ডেলিভারি চালু হবে।
দেশের পুঁজিবাজারে কমোডিটি ডেরিভেটিভসের সংযোজন তাই শুধু নতুন একটি ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম চালুর বিষয় নয়; এটি আমদানি-রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন ও কমোডিটি ব্যবসার মূল্যঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে পরিকল্পিত কাঠামোকে বাস্তবে কার্যকর করা, পর্যাপ্ত অংশগ্রহণকারী তৈরি করা এবং বাজারটিকে স্কেকুলেশনের পরিবর্তে প্রকৃত হেজিংয়ের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।