সড়ক সংস্কারে সমন্বয়হীনতা
রাজশাহী ওয়াসার ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প
ছবি সংগৃহীত
রাজশাহী নগরীতে পানি সরবরাহের অবকাঠামো সম্প্রসারণে প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পাইপলাইন স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে ১৪ কিলোমিটার সড়ক কাটা হয়েছে, আরও ৩৪ কিলোমিটার কাটার পরিকল্পনা রয়েছে। সড়ক পুনরুদ্ধারে রাজশাহী সিটি করপোরেশনকে ১৫ কোটি টাকা পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেলেও সংস্কারকাজের সময়সূচি ও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) বার্ষিক ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রাজস্বের অঙ্কেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে নগরীর পানি সরবরাহ উন্নয়নের এই বড় বিনিয়োগকে ঘিরে সামনে এসেছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর, সড়ক পুনরুদ্ধারের মান ও সময়সীমা কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে এবং আর্থিক প্রতিবেদনের পার্থক্যের ব্যাখ্যা কতটা স্বচ্ছ। রাজশাহী ওয়াসার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্রকল্পের লক্ষ্য পদ্মা নদীর পানি শোধন করে দৈনিক ২০ কোটি লিটার বা ২০০ এমএলডি পানি সরবরাহ করা। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর পানির চাহিদা পূরণে সক্ষমতা বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু এই অবকাঠামো নির্মাণের সময় নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী পারভেজ মাহমুদ দৈনিক শেয়ার বিজকে জানান, পাইপলাইন স্থাপনের জন্য মোট প্রায় ৪৮ কিলোমিটার সড়ক কাটার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ কিলোমিটার কাটা হয়েছে। সড়ক সংস্কারের জন্য গত জুনের আগেই সিটি করপোরেশনকে ১৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই অর্থ সিটি করপোরেশনের দাবির অর্ধেক; বাকি সড়ক কাটার সময় অবশিষ্ট অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, সংস্কারকাজের দরপত্র ডিসেম্বর মাসে হওয়ার কথা বলে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে অর্থ পরিশোধের তথ্য থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর সংস্কারকাজ কখন শুরু হবে এবং কত দিনে শেষ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এখানে অর্থ পরিশোধের বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই অর্থের বিপরীতে কাজের অগ্রগতি। কোনো সড়কের জন্য কত টাকা বরাদ্দ, কোনো অংশে সংস্কার হয়েছে, কাজের মানকে পরীক্ষা করছে এবং কখন সড়কগুলো ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় ফিরবে—এসব তথ্য জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। পারভেজ মাহমুদ উন্নয়নকাজে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার বিষয়টি তুলে ধরে আরো জানান, রাজশাহী সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং ওয়াসা আলাদা আলাদা সময়ে নিজ নিজ পরিকল্পনা ও বাজেট অনুযায়ী কাজ করে। ফলে একটি সংস্থা সড়ক নির্মাণের পর অন্য সংস্থার পাইপলাইন বা অন্য অবকাঠামোগত কাজের জন্য আবার সেই সড়ক কাটার প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন কোনো রাস্তা তৈরি করে। তার এক বছর পরে ওয়াসা সেখান থেকে পানির লাইন বা স্যুয়ারেজ লাইন করতে চায়।’ বিভিন্ন সংস্থার বিনিয়োগ একই সময়ে না আসায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এই বক্তব্য নগর উন্নয়নের একটি কাঠামোগত সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। সড়ক নির্মাণ, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন ও অন্যান্য ইউটিলিটি স্থাপনের কাজ যদি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় না হয়, তাহলে একই স্থানে একাধিকবার খনন ও সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এতে সরকারি অর্থের পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয়ের ঝুঁকি বাড়ে, কাজের সময় দীর্ঘায়িত হয় এবং নাগরিকদের দুর্ভোগ বাড়ে।
এ নিয়ে নগরায়ণ ও নগর পরিকল্পনারবিদরা তাদের মতামতে জানান, রাজশাহীতে ঠিক কত টাকার পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয় হয়েছে, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রকল্প ও ব্যয়ের নথি প্রয়োজন। যে সমন্বয়হীনতার কথা জান যাচ্ছে, তা যাচাই করতে সিটি করপোরেশন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং ওয়াসার উন্নয়ন পরিকল্পনা পাশাপাশি পর্যালোচনা করা খুবই জরুরি।
অন্যদিকে, নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাইপলাইন স্থাপনের পর কাটা অংশে সীমিত সংস্কারকাজ নিয়ে স্থানীয় জনগণ প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলছেন, কোনো স্থানে কাটা অংশের ওপরের আবরণ বসানো হলেও আশপাশের সড়কের সঙ্গে উচ্চতা ও পৃষ্ঠের সামঞ্জস্য ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ সড়কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে শুধু ওপরের পিচের ওপর নয়; নিচের ভিত্তি, উপকরণের মান, যথাযথ কম্প্যাকশন, পুরুত্ব এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপরও। তারা আরও বলছেন, সড়ক পুনরুদ্ধারের মান যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কাজের প্রাক্কলন, দরপত্রের শর্ত, পরিমাপ বই, উপকরণ পরীক্ষার প্রতিবেদন, ঠিকাদারের বিল এবং কাজ গ্রহণের নথি পর্যালোচনা করা দরকার। এসব নথি ছাড়া শুধু দৃশ্যমান অবস্থা দেখে নিম্নমানের কাজ বা অনিয়মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। তবে সড়কের কোনো অংশে দ্রুত ফাটল, দেবে যাওয়া বা গর্ত তৈরি হলে তার প্রকৌশলগত কারণ পরীক্ষা করা জরুরি।
এদিকে, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির প্রভাব শুধু চলাচলের অসুবিধায় সীমাবদ্ধ নয়। যানবাহনের যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় লাগলে জ্বালানি ব্যয় বাড়তে পারে, পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হতে পারে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ক্রেতা চলাচল কমতে পারে। তবে রাজশাহী নগরীতে এর মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি কত, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য পরিমাপ ছাড়া কোনো অঙ্ক উল্লেখ করা সমীচীন হবে না মনে করছেন নগরবাসী।
অন্যদিকে, সড়ক পুনরুদ্ধারের প্রশ্নের পাশাপাশি ওয়াসার আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাবেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক সংবাদ প্রতিবেদনে ওয়াসার বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রাজস্বের অঙ্কে পার্থক্যের তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনটিতে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বার্ষিক প্রতিবেদনে রাজস্ব দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা, আর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই দুই অঙ্ক যথাক্রমে ১৭ কোটি ২৬ লাখ ও ১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক প্রতিবেদনে রাজস্ব ১৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা দেখানো হলেও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তা ২০ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
ওয়াসার কর্মকর্তারা দৈনিক শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, বিল ইস্যু ও আদায়ের সময়ের পার্থক্যের কারণে কোনো কোনো অর্থ পরবর্তী অর্থবছরের হিসাবে যুক্ত হতে পারে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে লক্ষ্যমাত্রা দেখানো হয়েছে বলেও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রাজস্বের অঙ্ক আলাদা হলেই অর্থ আত্মসাৎ বা ইচ্ছাকৃতভাবে আয় কম দেখানোর প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু একই অর্থবছরের হিসাবের ভিত্তি ও পার্থক্যের কারণ স্পষ্ট না হলে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক মনে করেন বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞগণ।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওয়াসার মোট আয় ছিল ২৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং ব্যয় ৩৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী আয়-ব্যয়ের ব্যবধান ১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এ ব্যবধানের প্রকৃতি, অর্থায়নের উৎস এবং নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ জানতে মূল আর্থিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তারা আরও জানান, রাজশাহী ওয়াসার এই প্রকল্পের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কোন কোন সড়ক কতটুকু কাটা হয়েছে এবং সেগুলোর সংস্কারকাজের বর্তমান অবস্থা কী। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশনকে দেওয়া ১৫ কোটি টাকার বিপরীতে সড়কভিত্তিক ব্যয় ও কাজের অগ্রগতি কত। তৃতীয়ত, সংস্কারকাজের দরপত্র, কার্যাদেশ, মান পরীক্ষার প্রতিবেদন ও কাজ গ্রহণের সনদ কী বলছে। একই সঙ্গে বার্ষিক ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রাজস্বের পার্থক্যেরও নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এদিকে, রাজশাহীতে পর্যাপ্ত ও নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পদ্মার পানি শোধন করে সরবরাহের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বড় প্রকল্পের সাফল্য শুধু অর্থ ব্যয় বা পাইপলাইন স্থাপনের দৈর্ঘ্য দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন, কাজের সময়সীমা, সড়ক পুনরুদ্ধারের মান, জনদুর্ভোগ নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি অর্থের জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকার পানি প্রকল্পের সুফল পেতে হলে পানি সরবরাহের অবকাঠামোর পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনাতেও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। এক সংস্থার কাজের পর অন্য সংস্থার খনন, অর্থ পরিশোধের পরও সংস্কারের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক প্রতিবেদনের পার্থক্য—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তবেই উন্নয়নের ব্যয় ও সুফলের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা এবং নগরবাসীর স্বার্থ রক্ষা সম্ভব হবে মনে করে রাজশাহীর মানুষ।