জং ধরা সিলেবাস আর বেকারত্বের কারখানা: শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কাছে ৭ দফা, যা ২০২৬ পেরোলেই সর্বনাশ!
ছবি সংগৃহীত
ধরুন, আপনার নাম রাকিব। বাবা-মায়ের ঘাম ঝরানো টাকায় একটা নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করেছেন। এরপর চাকরির বাজারে গিয়ে দেখলেন, যে বইগুলো আপনি গত পাঁচ বছর মুখস্থ করেছেন, বাস্তবের দুনিয়ায় তার কানাকড়িও দাম নেই! আপনার হাতে একটা চকচকে সার্টিফিকেট আছে ঠিকই, কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়া বা আধুনিক বিশ্ব যে দক্ষতাগুলো খুঁজছে—তার কিছুই আপনাকে শেখানো হয়নি।
রাকিব একা নন; প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ এই এক বুক হতাশা নিয়ে বের হচ্ছেন। আমরা এক একটা ‘বেকারত্বের কারখানা’ তৈরি করেছি, যার নাম দিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়। আজ ২২ আগস্ট, ২০২৬। ঠিক এই মুহূর্তে সাভারের ব্র্যাক সিডিএম-এ দেশের উপাচার্যদের নিয়ে চলছে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ক নীতিনির্ধারণী সংলাপ। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্তারা সেখানে উপস্থিত। তাদের টেবিলে এখন ঘুরছে ইউজিসির ২০২৬-২০৩০ সালের ‘হায়ার এডুকেশন ট্রান্সফরমেশন’ বা উচ্চশিক্ষা রূপান্তরের খসড়া রোডম্যাপ। আমাদের কথা পরিষ্কার—অনেক গালভরা বুলি আমরা শুনেছি। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে এসে আর কোনো ‘দেখছি, দেখছি’ চলবে না। দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির (বা প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশনের) টেবিলে আজ দেশের আপামর ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে এই ৭টি অলঙ্ঘনীয় সংস্কারের দাবি রাখছি। এগুলো ২০২৬ পার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
১. মুখস্থবিদ্যার কফিনে শেষ পেরেক: সবার আগে চাই আউটকাম-বেজড এডুকেশন। ছাত্ররা কী মুখস্থ করল, তার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সে বাস্তব জীবনের সমস্যা কতটুকু সমাধান করতে পারছে, তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। পরীক্ষার খাতার পাতার পর পাতা গদ্য লেখার দিন শেষ। সিলেবাস হতে হবে শতভাগ বাজারের চাহিদামাফিক।
২. বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া মেলবন্ধন: চতুর্থ বর্ষে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ইন্ডাস্ট্রি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা সরকারি দপ্তরে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু সেকেলে তত্ত্ব পড়াবে, আর কোম্পানিগুলো বলবে ‘যোগ্য লোক পাচ্ছি না’—এই দ্বিচারিতা আর চলতে দেওয়া যায় না। অ্যাকাডেমিয়া এবং ইন্ডাস্ট্রির মাঝে শক্ত সেতু গড়তেই হবে।
৩. এআই ও প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর সায়েন্স ফিকশন নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা। ইউজিসিকে নিশ্চিত করতে হবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং ডিজিটাল ক্লাসরুম থাকছে। শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল ল্যাবরেটরিতে আটকে রাখলে চলবে না, মূল পাঠ্যক্রমে এআইয়ের প্রয়োগ ঢোকাতেই হবে।
৪. ইউজিসিকে ‘দন্তহীন বাঘ’ থেকে শক্তিশালী কমিশনে রূপান্তর: ইউজিসিকে ভেঙে ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন’ করার যে প্রস্তাবনা গত বছরের শেষে (২০২৫) দেওয়া হয়েছিল, তা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য বা শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক কমিশন গঠন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
৫. শিক্ষকদের জবাবদিহিতা ও মানোন্নয়ন: শিক্ষকরাই যদি মান্ধাতা আমলের নোটশিট দেখে পড়ান, তাহলে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে? শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পারফরম্যান্স মূল্যায়ন এবং আধুনিক শিক্ষাদানের পদ্ধতির (যেমন—‘হিট’ প্রজেক্টের আওতায় মাস্টার ট্রেইনার তৈরি) প্রয়োগ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি নয়, পদোন্নতি হতে হবে গবেষণার ভিত্তিতে।
৬. ইটের দালান নয়, বিনিয়োগ হোক গবেষণায়: বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট মানেই শুধু নতুন নতুন ভবন আর ইট-পাথরের গেট বানানো নয়। বাজেটের একটা বিশাল অংশ বরাদ্দ করতে হবে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা এবং উদ্ভাবনে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা বাড়াতে হবে, যাতে আমাদের শিক্ষার্থীরা গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে।
৭. ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও সফট স্কিলস: কেবল সিজিপিএ নয়, প্রতিটি ক্যাম্পাসে একটি করে সক্রিয় ‘ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ থাকতে হবে। যোগাযোগের দক্ষতা, টিমওয়ার্ক, নৈতিকতা এবং প্রফেশনালিজম শেখানো এখন ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়, এগুলো এই যুগে টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও ইউজিসি চেয়ারম্যান মহোদয়, আপনারা যে পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, তা যেন শুধু ফাইলে আটকে না থাকে। নির্দিষ্ট ডেডলাইন ঠিক করুন: কোন সংস্কার কবে বাস্তবায়ন হবে, তার সুস্পষ্ট টাইমলাইন প্রকাশ করুন এবং তা জনসমক্ষে আনুন। প্রতি তিন মাস পর পর অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য একটি পাবলিক ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড তৈরি করুন। সাধারণ মানুষ যেন দেখতে পারে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কতটা পিছিয়ে বা এগিয়ে আছে।বাজেট সমন্বয়: গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতের বাজেট আগামী অর্থবছর থেকেই দ্বিগুণ করতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাত থেকে অর্থ কেটে এনে শিক্ষায় ঢালুন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচাই করে প্রতি বছর জাতীয়ভাবে র্যাংকিং প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করুন, যাতে শিক্ষার্থীরা ভর্তির আগেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আমাদের তরুণদের মেধা আছে, স্বপ্ন আছে। তাদের শুধু দরকার একটা সঠিক পথ। ২০২৬ সাল হোক আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সত্যিকারের ঘুরে দাঁড়ানোর বছর। এই সাতটি সংস্কার যদি এখন বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে এই ভুলের চড়া মাশুল গুনতে হবে গোটা জাতিকে। আমরা কি সত্যিই আরেকটি হতাশাগ্রস্ত, বেকার প্রজন্ম তৈরি করতে চাই? সিদ্ধান্ত এখন আপনাদের টেবিলে।