শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

​​​​​​​হাসান শিরাজী

প্রকাশ: ১৮:০৮, ১৩ আগস্ট ২০২৬

পাসপোর্ট আছে, দক্ষতা নেই: কারিগরি শিক্ষার দৈন্যদশায় আমরা কেন কেবল ‘লেবার’ পাঠাচ্ছি, ‘এক্সপার্ট’ নয়

পাসপোর্ট আছে, দক্ষতা নেই: কারিগরি শিক্ষার দৈন্যদশায় আমরা কেন কেবল ‘লেবার’ পাঠাচ্ছি, ‘এক্সপার্ট’ নয়

ছবি সংগৃহীত

দুবাইয়ের তীব্র গরমে যখন ঘাম মুছছিলেন শফিক, তখন পাশ দিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন ফিলিপাইনের এক যুবক। দুজনেই একই কোম্পানিতে কাজ করেন। শফিক কাজ করেন নির্মাণশ্রমিক বা ‘লেবার’ হিসেবে, মাস শেষে পান ৩০০ থেকে ৪০০ ডলার। আর ফিলিপাইনের সেই যুবক কাজ করেন সুপারভাইজার বা টেকনিশিয়ান হিসেবে, যার বেতন শফিকের প্রায় পাঁচ থেকে ছয়গুণ। অথচ শফিক কিন্তু বোকা বা অলস নন। তার অভাব শুধু একটি জায়গাতে তার কোনো কারিগরি দক্ষতা বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সার্টিফিকেট নেই।

এটি শুধু শফিকের গল্প নয়; প্রতি বছর দেশের বাইরে যাওয়া লাখ লাখ বাংলাদেশি তরুণের গল্প। আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলি, প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ কর্মী বিদেশে পাঠাচ্ছি আমরা। কিন্তু পর্দার পেছনের সত্যটা বড়ই নির্মম। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সামপ্রতিক তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, দেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৮২ শতাংশেরও বেশি অদক্ষ বা স্বল্প-দক্ষ। বাকিদের মধ্যে যে অল্প কয়েকজন দক্ষ হিসেবে যান, তাদের সংখ্যাটা নিতান্তই হতাশাজনক।

সারা দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা টিভিইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে আপনি হয়তো চকচকে নতুন ভবন দেখতে পাবেন। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই আসল চিত্রটা পরিষ্কার হবে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের বেশিরভাগ কারিগরি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোতে জং ধরেছে। তার চেয়েও বড় সংকট হলো যোগ্য শিক্ষকের অভাব। যারা শেখাচ্ছেন, তাদের নিজেদেরই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় নেই।

আমরা বাজেটে শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ রাখি, তার খুব সামান্যই যায় কারিগরি শিক্ষায়। আর সেই সামান্য বরাদ্দেরও সিংহভাগ খরচ হয় দালানকোঠা আর অবকাঠামো নির্মাণে। ল্যাবের সরঞ্জাম কেনা বা শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য যে বাজেট দরকার, সেখানে সবসময়ই থাকে টানাটানি। ফলে একজন ছাত্র যখন ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং বা ইলেকট্রিক্যালের কাজ শিখে বের হচ্ছেন, তখন তিনি শিখছেন পুরোনো আমলের প্রযুক্তি। সেই বিদ্যা নিয়ে যখন তিনি আধুনিক ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিতে যাচ্ছেন, তখন তার ওই সার্টিফিকেটের কানাকড়িও দাম থাকছে না।

আমরা ভুলে যাচ্ছি, আজকের দুনিয়া শুধু মানুষের সংখ্যা দেখে চাকরি দেয় না, স্কিল বা দক্ষতা দেখে দেয়। জাপান, কোরিয়া বা ইউরোপের বাজারগুলো আমাদের জন্য দরজা খুলে বসে আছে, কিন্তু তারা চায় নার্স, কেয়ারগিভার, অটোমোবাইল মেকানিক কিংবা আইটি এক্সপার্ট। আর আমরা পাঠাচ্ছি পরিচ্ছন্নতাকর্মী আর কৃষিশ্রমিক। 

বিদেশের মাটিতে আমাদের কর্মীদের এই ‘লেবার’ ট্যাগ থেকে বের করে ‘এক্সপার্ট’ বানাতে চাইলে নীতিনির্ধারকদের এখনই কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। ইট-পাথরে নয়, ল্যাবে ইনভেস্ট করুন। শুধু নতুন নতুন ট্রেনিং সেন্টারের ভবন বানালে হবে না। বাজেটের একটা বড় অংশ সরাসরি ল্যাবের আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার পেছনে বরাদ্দ করতে হবে। আজকের দিনে দুবাই বা জাপানে যে মেশিন ব্যবহার হয়, ঠিক সেই মেশিনই আমাদের ল্যাবে থাকতে হবে। যিনি শেখাবেন, তাকে আগে শিখতে হবে। কারিগরি শিক্ষকদের নিয়মিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে মাস্টার ট্রেইনার এনে দেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

গদবাঁধা ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে ইউরোপে কোন ধরনের কর্মীর চাহিদা বাড়বে? জাপানে কী ধরনের টেকনিশিয়ান লাগবে? সেই আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বুঝে নতুন কোর্স চালু করতে হবে। আমাদের কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়, বিদেশের মাটিতে তার মূল্যায়ন হয় না বললেই চলে। তাই আন্তর্জাতিক নামিদামি প্রতিষ্ঠান বা বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে, যাতে আমাদের কর্মীরা দেশের মাটিতে বসেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ পেতে পারেন।

দেশের ভেতরের শিল্পকারখানাগুলোর সঙ্গে কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি চুক্তি থাকতে হবে। ছাত্ররা অর্ধেক সময় ল্যাবে শিখবে, বাকি অর্ধেক সময় সরাসরি ফ্যাক্টরিতে হাতে-কলমে কাজ করবে। আমাদের দেশের মানুষের মতো পরিশ্রমী মানুষ দুনিয়াতে খুব কমই আছে। এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামের সঙ্গে যদি একটু কারিগরি দক্ষতার মিশ্রণ ঘটানো যায়, তবে দেশের রেমিট্যান্স এক লাফে তিনগুণ হওয়া কোনো অবাস্তব স্বপ্ন নয়। শফিকদের আর তখন তপ্ত রোদে পুড়ে অন্যের গালি শুনতে হবে না।

সময় এসেছে কেবল মানুষ রপ্তানি করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে ‘দক্ষতা’ রপ্তানি করার দিকে মনোযোগ দেওয়ার। কারণ সস্তা শ্রমের বাজার এক দিন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু মেধা ও দক্ষতার বাজার চিরকালই দামি।