শিক্ষকের ঘামে ভেজা শার্ট আর আমাদের ‘উন্নয়ন’: আমরা কি জেনেশুনেই নিজেদের পঙ্গু করছি?
ছবি এআই
শফিক সাহেবের পকেটটা সবসময়ই একটু বেশি হালকা। মফস্বল শহরের একটা স্কুলে পনেরো বছর ধরে অংক পড়াচ্ছেন তিনি। মাস শেষে বেতন যা পান, তা দিয়ে বাজারের ব্যাগ অর্ধেকও ভরে না। বাধ্য হয়ে তাকে রাত দশটা পর্যন্ত প্রাইভেট পড়াতে হয়, কখনো বা ছুটির দিনে অন্যের দোকানের হিসাব মেলাতে হয়। অথচ এই শফিক স্যারই ক্লাসে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন আমাদের সন্তানদের শেখান বড় স্বপ্ন দেখতে। কিন্তু যে মানুষটার নিজের পেটে ক্ষুধা আর মাথায় বাড়িভাড়ার চিন্তা, সে কীভাবে একটা জাতির ভবিষ্যৎ গড়বে?
আমরা বড় বড় ফ্লাইওভার বানাচ্ছি, মেট্রোরেলে চড়ছি। খবরের কাগজে চোখ রাখলেই চারদিকে ‘উন্নয়নের’ ঝমঝম শব্দ শোনা যায়। কিন্তু একটু গভীরভাবে খুঁজলে একটা ভয়ংকর সত্য বেরিয়ে আস্তেযে দেশ তার শিক্ষকদের সবচেয়ে কম বেতন দেয়, সে দেশ আসলে টাকা বাঁচাচ্ছে না; বরং নিজেদের অনুন্নত রাখার পেছনেই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটা করছে।
খোঁজ নিয়ে দেখুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটা এখন আর শিক্ষক হতে চায় না। সে চায় পুলিশ হতে, অ্যাডমিন ক্যাডার হতে কিংবা কোনো বহুজাতিক কোম্পানির এসি রুমে বসতে। দোষটা তার নয়। সমাজ আর রাষ্ট্র তাকে শিখিয়েছ্তেশিক্ষকতায় সম্মান আছে, কিন্তু পেট চালানোর টাকা নেই। একটা সময় ছিল যখন সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষগুলোই শিক্ষকতায় আসতেন। আর আজ? পেশা হিসেবে শিক্ষকতা অনেকের কাছেই ‘অন্য কিছু না পেয়ে’ বেছে নেওয়া একটা অপশন। ফলে যারা বাধ্য হয়ে এই পেশায় আসছেন, তাদের অনেকেই শ্রেণিকক্ষে নিজেদের শতভাগ দিতে পারছেন না। এর চূড়ান্ত মাশুল গুনছে আমাদের সন্তানেরা। আমরা এমন একটা প্রজন্ম তৈরি করছি যাদের কাছে সার্টিফিকেট আছে, কিন্তু দক্ষতা বা নতুন কিছু ভাবার ক্ষমতা নেই।
পৃথিবীর যে দেশগুলো আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছ্তেফিনল্যান্ড, জাপান বা সিঙ্গাপুর্ততাদের দিকে তাকান। সেখানে সবচেয়ে মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের বেতন-ভাতা সমাজের অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে আকর্ষণীয়। কারণ তারা জানে, একটা ইট-পাথরের সেতু ৫০ বছর টিকবে, কিন্তু একজন ভালো শিক্ষকের তৈরি করা প্রজন্ম একটা দেশকে ৫০০ বছর এগিয়ে নেবে। আমরা ঠিক এখানেই ভুলটা করছি। আমরা ভাবছি দালানকোঠা বানালেই উন্নয়ন হবে, অথচ যারা সেই দালানে বসে দেশকে এগিয়ে নেবে, তাদের মেরুদ্লটাই আমরা ভেঙে দিচ্ছি।
এসি রুমে বসে যারা দেশের পলিসি বানান, তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ্তকাগজের ফাইল থেকে চোখ তুলে একবার বাস্তবের দিকে তাকান। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে এখনই এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি। বেতন কাঠামোর খোলনলচে বদলান: শিক্ষকদের বেতন এমন হতে হবে যেন তাদের সংসার চালানোর জন্য দ্বিতীয় কোনো আয়ের পথ খুঁজতে না হয়। এন্ট্রি-লেভেল শিক্ষকদের বেতন বাড়িয়ে এমন একটা মানদ্ল তৈরি করুন, যাতে প্রথম শ্রেণীর মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হয়।
ভাতা ও আবাসন সুবিধা: শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতা বাস্তবসম্মত করুন। শিক্ষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা আবাসনের ব্যবস্থা করাটা কোনো দয়া নয়, এটা রাষ্ট্রের টিকে থাকার স্বার্থেই জরুরি। কাজের পরিবেশ ও মর্যাদা: শিক্ষকদের কেরানির মতো ব্যবহার করা বন্ধ করুন। ভোটার তালিকা হালনাগাদ বা আদমশুমারির মতো সব ধরনের বাড়তি কাজের চাপ থেকে তাদের মুক্তি দিন। তাদের কাজ পড়ানো, তাদের সেই কাজটাই মন দিয়ে করতে দিন। বাজেটে শিক্ষার অগ্রাধিকার: জিডিপি-র মাত্র ২ শতাংশের আশেপাশে শিক্ষাবাজেট রেখে আসল ‘উন্নয়ন’ হয় না। আন্তর্জাতিক মানদ্ল অনুযায়ী এটা অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশে উন্নীত করুন। আর সেই টাকার বড় একটা অংশ শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধায় খরচ করুন। প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন: শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন। যারা ভালো করছেন, তাদের জন্য ইনসেনটিভ বা পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখুন, যাতে তাদের দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হয়।
শফিক স্যারের ঘামে ভেজা শার্টটা শুধু তার ব্যক্তিগত দারিদ্র্যের প্রতীক নয়, এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতার দলিল। একটা সস্তা শিক্ষাব্যবস্থা কখনো দামি ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে না। শিক্ষকদের পেটে ক্ষুধা রেখে আমরা যদি ভাবি যে দেশ বিশ্বজয়ের পথে হাঁটছে, তবে আমরা আসলে বোকার স্বর্গে বাস করছি। সময় থাকতে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে শিখুন, নইলে এই অনুন্নয়নের ফাঁদ থেকে আমাদের কেউ বের করতে পারবে না।