ডিগ্রির সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয় না হলে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হবে না
ছবি সংগৃহীত
বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় একটি ডিগ্রি অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থী কর্মজীবনে ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারবে—এমন ধারণা প্রচলিত ছিল। কিন্তু এখন কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু সার্টিফিকেট দেখে নিয়োগ দেয় না; তারা খোঁজে এমন মানুষ, যাদের মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা রয়েছে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞানের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী যেন শুধু একটি ডিগ্রির অধিকারী না হয়, বরং সে যেন নিজের জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে, এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করেও চাকরির বাজারে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হয়। কারণ তাদের মধ্যে অনেক সময় যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে আমাদের উচ্চশিক্ষার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ভালো নম্বর অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, কিন্তু জ্ঞানকে কীভাবে কাজে লাগাতে হবে, সেটি শেখার সুযোগ কম পায়।
একজন শিক্ষার্থী যদি শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য মনে রাখে, কিন্তু সেই তথ্য বিশ্লেষণ করতে না পারে বা বাস্তব সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে তার শিক্ষা অসম্কূর্ণ থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখানো। তাদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা, নতুন ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের সুযোগ দেওয়া।
বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে এমন কর্মী প্রয়োজন, যারা শুধু নির্দেশনা অনুসরণ করবে না; বরং নিজের উদ্যোগে কাজ করতে পারবে এবং নতুন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বর্তমান কর্মক্ষেতরের চাহিদা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম নিয়মিত পরিবর্তন করা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তি, শিল্প এবং ব্যবসার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
কয়েক বছর আগে যে দক্ষতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখন তার সঙ্গে নতুন অনেক দক্ষতা যুক্ত হয়েছে। যেমন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেকসই উৎপাদন এবং উদ্ভাবনী চিন্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। শুধু নতুন কোর্স চালু করলেই হবে না; শিক্ষাদানের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রকল্পভিত্তিক কাজ, গবেষণা, দলগত সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
একটি দক্ষ মানবসম্কদ তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে শক্তিশালী সম্কর্ক প্রয়োজন। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো জানে কর্মক্ষেত্রে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান ও গবেষণার জায়গা। এই দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে শিক্ষার্থীরা আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবে। আমি মনে করি, শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত করা উচিত। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইন্টার্নশিপ, শিল্প পরিদর্শন এবং বাস্তব প্রকল্পের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্কর্কে ধারণা পায়, তখন তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং কর্মজীবনে প্রবেশ সহজ হয়।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সময়ে প্রযুক্তি আমাদের জীবন ও কর্মক্ষেত্রকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন প্রায় সব পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞানই যথেষ্ট। একজন দক্ষ পেশাজীবীর মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণ থাকতে হবে। কারণ প্রযুক্তি অনেক কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু নতুন চিন্তা তৈরি, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানুষের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করার ক্ষমতা মানুষের কাছেই থাকবে।
শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যদি আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তন সম্কর্কে ধারণা না রাখেন, তাহলে শিক্ষার্থীদেরও সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা কঠিন। তাই শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং শিল্প খাতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষকদের শুধু পাঠদানকারী হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের পরামর্শদাতা ও দক্ষতা উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের দক্ষতা শুধু শ্রেণিকক্ষের মাধ্যমে তৈরি হয় না। বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রম, বিতর্ক, গবেষণা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নেতৃত্বমূলক কার্যক্রম এবং সামাজিক উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে কাজ করা, নেতৃত্ব দেওয়া, যোগাযোগ করা এবং দায়িত্ব নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এসব কার্যক্রম আরও উৎসাহিত করতে হবে।
আগামী দিনের কর্মক্ষেত্র আরও পরিবর্তনশীল হবে। নতুন নতুন প্রযুক্তি আসবে, অনেক কাজের ধরন পরিবর্তিত হবে। তাই একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় দক্ষতা হবে নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা। আমাদের এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে, যারা পরিবর্তনকে ভয় পাবে না; বরং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে। উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় শুধু একটি ডিগ্রি নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা এবং বাস্তব জ্ঞান নিয়ে বের হবে। তাই এখন সময় এসেছে উচ্চশিক্ষাকে ডিগ্রিকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বের করে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে নিয়ে যাওয়ার। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষিত মানুষের সংখ্যার ওপর নয়, বরং তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতার ওপর।
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়