উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ডিগ্রি দেওয়া নয়, দক্ষ মানুষ তৈরি করা
ছবি সংগৃহীত
বর্তমান সময়ে উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের কতটা কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারছি। শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থী সফল হবে, এমন ধারণা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। একটি ডিগ্রি একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক অর্জনের স্বীকৃতি, কিন্তু কর্মজীবনে সফল হওয়ার জন্য তার প্রয়োজন আরও অনেক বেশি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব জ্ঞান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়; বরং একজন শিক্ষার্থীকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে সে বাস্তব জীবনের সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারে।
আমাদের দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্কন্ন করছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা একাডেমিকভাবে ভালো করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো, শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই দূরত্ব কমানো এখন সময়ের দাবি।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, কিন্তু একটি বিষয় বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, সেটি শেখার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম পায়।
শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করানোর মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা সম্ভব নয়। তাদের চিন্তা করতে শেখাতে হবে, বিশ্লেষণ করতে শেখাতে হবে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সুযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে টেক্সটাইলের মতো একটি শিল্পভিত্তিক বিষয়ে শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। একজন টেক্সটাইল গ্র্যাজুয়েটকে উৎপাদন প্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন সম্কর্কে ধারণা রাখতে হবে। বর্তমান শিল্প খাত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তারা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।
আমাদের উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্কর্ক তৈরি করা। শিল্পে কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হচ্ছে, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়কে জানতে হবে। একইভাবে শিল্প খাতকেও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
পাঠ্যক্রম কোনো স্থির বিষয় নয়। সময়ের সঙ্গে এটি পরিবর্তন করতে হবে। কয়েক বছর আগে যে দক্ষতার প্রয়োজন ছিল, বর্তমানে তার ধরন অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। তাই নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বিশেষ করে টেক্সটাইল শিল্পে এখন অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, টেকসই উৎপাদন এবং উদ্ভাবনের গুরুত্ব বাড়ছে। এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
একজন শিক্ষার্থী যখন বাস্তব পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পায়, তখন তার শেখার পরিধি অনেক বাড়ে। তাই শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে হবে না; শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। ইন্টার্নশিপ, শিল্পভিত্তিক প্রকল্প, গবেষণা কার্যক্রম এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। তবে ইন্টার্নশিপ যেন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা না হয়। একজন শিক্ষার্থী সেখানে কী শিখছে, কী ধরনের কাজ করছে এবং তার দক্ষতা কীভাবে বাড়ছে—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, একজন শিক্ষার্থী যেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার আগেই কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্কর্কে ধারণা পায়।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু প্রযুক্তি জানলেই একজন শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে সফল হবে না। তার সঙ্গে প্রয়োজন যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের মানসিকতা।
অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ভালো, কিন্তু তারা নিজেদের চিন্তা সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না বা একটি দলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে সমস্যায় পড়ে। এসব দক্ষতা পাঠ্যক্রমের বাইরের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তৈরি হয়। ক্লাব কার্যক্রম, গবেষণা, প্রতিযোগিতা, সামাজিক কার্যক্রম এবং দলগত প্রকল্প শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং নেতৃত্বের গুণ তৈরি করে।
শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের বিষয়বস্তু পড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারেন না। তাকে জানতে হবে বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তন, শিল্পের চাহিদা এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার সম্কর্কে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাদের গবেষণার সুযোগ দিতে হবে এবং শিল্পখাতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একজন শিক্ষক যত বেশি বাস্তব জগতের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত হবেন, তিনি শিক্ষার্থীদের তত ভালোভাবে প্রস্তুত করতে পারবেন।
দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির জন্য শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও গবেষণার জায়গা, আর শিল্প খাত বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা। এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটলে শিক্ষার্থীরা আরও কার্যকর শিক্ষা পাবে। যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ, শিল্পভিত্তিক প্রকল্প এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই সম্কর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্কদ। কিন্তু এই সম্কদকে কাজে লাগাতে হলে তাদের সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু বেশি সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা নয়; বরং এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা, যারা দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং কর্মক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আমি মনে করি, ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা হবে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজ করবে।
শুধু ডিগ্রি অর্জনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে দক্ষতা অর্জনের সংস্কৃতির দিকে আমাদের যেতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবে, তখন তার হাতে শুধু একটি সার্টিফিকেট থাকবে না; বরং থাকবে বাস্তব কাজ করার সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার শক্তি।
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়