মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ সাদী খান 

প্রকাশ: ২২:৩৫, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২২:৩৭, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৬,৯৬,৮৫৯ টাকার  প্রকল্প অনুমোদন

দেশব্যাপী খাল ও জলাশয় খনন 

৬,৯৬,৮৫৯ টাকার  প্রকল্প অনুমোদন

ছবি সংগৃহীত

দেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং সেচ সুবিধা বাড়াতে দেশব্যাপী খাল, ছোট নদী ও জলাশয় খনন ও পুনঃখননের বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্পূর্ণ সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) কর্তৃক প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৮৫৯ টাকা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জুন ২০৩০ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত প্রকল্প যাচাই কমিটির সভায় এই পুনর্গঠিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারের ‘নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬’-এ দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, ছোট নদী ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের যে অঙ্গীকার রয়েছে, এই প্রকল্প মূলত তারই অংশ। জাতীয় পানি নীতিমালার আলোকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ বা ভূপৃষ্ঠের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতেই প্রকল্প গ্রহণ করা। পলি ভরাট, অবৈধ দখল ও নাব্যতা হ্রাসের কারণে যেসব এলাকায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বর্ষায় বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমে খরা দেখা দিচ্ছে, সেসব এলাকাকে এই প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে বহু অঞ্চলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমপ্রসারিত হয়। খালগুলোয় পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতজনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায় অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সর্বোপরি, নদী-খাল-বিলের প্রাকৃতিক সংযোগ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য, ভূপৃষ্ঠস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান প্রকল্প প্রণয়নে ওই সময়ের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প নথিতে দেখা যায়, জাতীয় পানি নীতি এবং অন্যান্য প্রচলিত পানি ব্যবস্থাপনা নীতিমালার আলোকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। নির্বাচিত এলাকাগুলোয় প্রস্তাবিত খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন সরকারের এই রূপকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি অবদান রাখবে। প্রকল্পের জন্য এমন এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যেখানে খাল, ছোট নদী ও জলাধারের পলি ভরাট, অবৈধ দখল ও নাব্যতা হ্রাসের কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশিত হতে না পেরে বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রাপ্যতার অভাবে খরা ও তীব্র সেচ সংকট দেখা দেয়। নির্বাচিত এলাকাগুলোয় জলাধারগুলোর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরাসরি ২৫৩ দশমিক ৯৯ লাখ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। স্থানীয় কৃষক, ছেলে ও পানি ব্যবহারকারী সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রকল্প কাঠামোর অন্তত ৫৪ শতাংশ টেকসই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা। প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ২২ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে ভূমিক্ষয় হ্রাস করা। খাল, ছোট নদী ও জলাশয়ের অবৈধ দখল, ভরাট ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে একটি সার্বিক ‘জাতীয় পানি সম্পদ ডেটাবেজ’ তৈরি এবং সম্পূর্ণ জিআইএস-ভিত্তিক মনিটরিং ও তথ্য ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন।
দেশব্যাপী মোট ৬,২৭৫ দশমিক ১২৫ কিলোমিটার খাল এবং ২,৫৯৬ দশমিক ২৩৪ কিলোমিটার ছোট নদী পুনঃখনন করা হবে। পাশাপাশি ২৬ দশমিক ৬২০ কিলোমিটার জলাশয় খনন ও পুনঃখনন করা হবে। এর ফলে জলাধারগুলোর প্রায় ৩ হাজার ৩০০ লাখ ঘনমিটার পানিধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ১৭ দশমিক ৫০ লক্ষ হেক্টর এলাকার জলাবদ্ধতা হ্রাস পাবে। ২ দশমিক ৬৫ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ১০ দশমিক ১০ লক্ষ মেট্রিক টন কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি হবে। এছাড়া উন্মুক্ত জলাশয়ের পরিবেশগত স্বাস্থ্য ফিরিয়ে এনে বার্ষিক মৎস্য উৎপাদন প্রায় ৭ হাজার ৯৮৪ মেট্রিক টন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরাসরি ২৫৩ দশমিক ৯৯ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ভূমিক্ষয় রোধে ২ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান (গাছপালা রোপণ) করা হবে।
ডিজিটাল মনিটরিং: খাল ও নদীর অবৈধ দখল, ভরাট ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি সার্বিক ‘জাতীয় পানিসম্পদ ডেটাবেজ’ তৈরি এবং সম্পূর্ণ জিআইএস-ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। প্রকল্পের অন্তত ৫৪ শতাংশ টেকসই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হবে স্থানীয় কৃষক, জেলে ও পানি ব্যবহারকারী সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণে।
এই প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেওয়া দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির (১৯৭৭-১৯৮১) ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের উলাসী-যদুনাথপুর খালে নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে তিনি এই বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, যার অধীনে প্রায় ৫ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছিল। সেই সময় গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হওয়া, বোরো ও রবিশস্যের ফলন বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথ চালুর যে সুফল পাওয়া গিয়েছিল, বর্তমান প্রকল্পেও সেই সফলতার পুনরাবৃত্তি আশা করছে সরকার।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় নদী ও খালের নাব্যতা পুনরুদ্ধার করে পরিবেশবান্ধব অভ্যন্তরীণ নৌপথ পুনরুজ্জীবিত করা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।