সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম 

প্রকাশ: ২৩:৩৯, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৩৯, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভ্যালমন্ট ফ্যাশনসের পাঁচ ‘ভূতুড়ে রপ্তানি’ চালান আটক

কনটেইনারে পণ্য নেই, কাগজে রপ্তানি সাড়ে ৫ কোটি টাকা

কনটেইনারে পণ্য নেই, কাগজে রপ্তানি সাড়ে ৫ কোটি টাকা

ছবি সংগৃহীত

কাগজে রপ্তানি হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার তৈরি পোশাক। এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভার ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’-এ নিবন্ধিত হয়েছে পাঁচটি রপ্তানি চালান। বিল অব এক্সপোর্টে দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি বা প্রায় ১২১ টন পণ্য। অথচ যে আইসিডি ডিপো থেকে এসব পণ্য বিদেশে পাড়ি জমানোর কথা, সেখানে গিয়ে মিলল এক অন্য বাস্তবতা—কনটেইনার কিংবা ডিপো চত্বরে তৈরি পোশাকের কোনো অস্তিত্ব নেই, আছে কেবলই এক টুকরো শূন্যতা।
শুল্কমুক্ত সুবিধার আড়ালে আনা বন্ডেড কাঁচামাল চোরাবাজারে গায়েব করে কাগজপত্রে ‘ভূতুড়ে’ রপ্তানি দেখানোর এই অদ্ভুত মায়াজাল বুনেছিল বিজিএমইএ নিবন্ধিত তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড। তবে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সময়োচিত ও বিশেষ তৎপরতার কারণেই এই যাত্রায় উন্মোচিত হলো জালিয়াতির পুরো ছক; আটকে গেল সাড়ে ৫ কোটি টাকার ভুয়া রপ্তানির চক্রান্ত। পণ্য ফিজিক্যালি না পৌঁছানো সত্ত্বেও কাস্টমস সার্ভারে প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। আইসিডি ডিপোতে পণ্য না গিয়েও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার এই ‘ভূতুড়ে’ ঘটনাকে ঘিরে এখন তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর ও রাজস্ব অঙ্গনে। 
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সার্ভারে রপ্তানি কনসাইনমেন্টের অনলাইন মনিটরিং ও রিস্ক ম্যানেজমেন্ট পর্যালোচনার সময় ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পাঁচটি রপ্তানি চালান নজরে আসে। চালানগুলোর গন্তব্য, পণ্যের ধরন, ঘোষিত ওজন এবং প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চালানগুলো আটক করে অধিকতর যাচাই-বাছাই শুরু করা হয়।
গোয়েন্দা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রচলিত প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো—বিশেষ করে জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও ডেনমার্ক। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও রাশিয়াও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের উল্লেখযোগ্য বাজার। তবে ভ্যালমন্ট ফ্যাশনসের আলোচ্য পাঁচটি চালানের গন্তব্য হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইনের নাম উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত রপ্তানি বাজারের তুলনায় এসব গন্তব্য এবং চালানসংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের কাছে বাড়তি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। 
সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় প্রতিষ্ঠানটির বন্ডেড সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল ও ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণের তুলনামূলক হিসাব বিশ্লেষণে। কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটি যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে; তার তুলনায় ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এ পরিমাণ স্বাভাবিক ইনপুট-আউটপুট কো-ইফিশিয়েন্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। 
দাখিলকৃত বিল অব এক্সপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, এসব পণ্য ইসাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো থেকে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা সরেজমিন সংশ্লিষ্ট ডিপোতে গিয়ে পণ্যগুলো পরীক্ষণের জন্য উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। তবে ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনো পণ্যই দেখাতে পারেননি। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানির জন্য ঘোষিত পণ্যগুলো আদৌ ডিপোতে প্রবেশ করেনি। পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করলেও কীভাবে এসব চালানের কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো, সে বিষয়ে ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। 
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, কাগজপত্রে পাঁচটি চালানে মোট ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি পণ্য রপ্তানি দেখানো হয়েছে। এসব পণ্যের ঘোষিত রপ্তানি মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কিন্তু সরেজমিন যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ডিপোতে ঘোষিত পরিমাণের কোনো পণ্যেরই অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে কাস্টমস গোয়েন্দাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, পণ্যের বাস্তব অস্তিত্ব ছাড়াই পাঁচটি চালানের বিপরীতে রপ্তানি প্রদর্শনের অপচেষ্টা করা হয়েছিল; যা কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের নজরদারি ও বিশেষ তৎপরতায় প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। 
বর্তমানে কাস্টমস হাউস, আইসিডি, চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করা হয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রপ্তানি পণ্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট কনটেইনার ডিপোতে প্রবেশ করে। এরপর পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে রপ্তানি কার্যক্রম শেষ করা হয়। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করেই কীভাবে রপ্তানির কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। একই সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত এবং কোনো পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ডিপোর সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য কাস্টমস আইনসহ অন্যান্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইংল্যান্ড কনটেনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব ও ইসাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ম্যানেজার রুহুল আমিন সিকদার শেয়ার বিজকে বলেন, আমি এই সময়ে দেশে ছিলাম না। বিষয়টি সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। শুল্ক গোয়েন্দারা সব সময়ই এমন অভিযান চালায়, তবে এবার কখন চালিয়েছে জানা নেই। 
অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজিজুল হাসান বাঝমিকে বেশ কয়েকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তাই তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।