বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:৪৪, ২৩ আগস্ট ২০২৬

বাংলা কিউআরে লেনদেন ১১০ কোটি টাকা ছাড়াল

বাংলা কিউআরে লেনদেন ১১০ কোটি টাকা ছাড়াল

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে একক কিউআর বা ‘এক দেশ এক কিউআর’ ব্যবস্থা চালুর পর বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের নিজস্ব বা প্রোপ্রাইটরি কিউআর কোডের পরিবর্তে একক বাংলা কিউআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এই প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে যেখানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকার লেনদেন হতো, সেখানে গত সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেনের আর্থিক মূল্য বেড়ে ১১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।

অর্থাৎ একক কিউআর ব্যবস্থা চালুর পর বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দৈনিক লেনদেনের আর্থিক মূল্য প্রায় তিনগুণ হয়েছে। একই সময়ে লেনদেনের সংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একক কিউআর ব্যবস্থার কারণে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার আরও সহজ হওয়ায় এ প্রবৃদ্ধি ঘটছে। পাশাপাশি ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাংলা কিউআর সম্প্রসারণও লেনদেন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুলাইয়ের শুরুতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার বাংলা কিউআর লেনদেন সম্পন্ন হতো। এসব লেনদেনের মোট আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৩৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। তবে একক কিউআর ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর ধীরে ধীরে লেনদেনের সংখ্যা ও মূল্য—দুই সূচকেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

গত সপ্তাহে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ফলে জুলাইয়ের শুরু থেকে লেনদেনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি আর লেনদেনের আর্থিক মূল্য বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বাংলা কিউআর এখন শুধু ছোট অঙ্কের কেনাকাটার মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তুলনামূলক বড় অঙ্কের ডিজিটাল লেনদেনেও এর ব্যবহার বাড়ছে। গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে।

দেশে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা কিউআর কোড ব্যবহারের কারণে অনেক সময় গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্টে জটিলতা তৈরি হতো। কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একটি ব্যাংকের কিউআর থাকলে অন্য ব্যাংক বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারত। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও একাধিক কিউআর কোড রাখতে হতো।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক ‘এক দেশ এক কিউআর’ নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। এর আওতায় বাংলা কিউআরকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বা প্রোপ্রাইটরি কিউআর কোডের পরিবর্তে বাংলা কিউআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়।

এর ফলে একজন ব্যবসায়ী একটি বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করেই বিভিন্ন ব্যাংক ও অনুমোদিত ডিজিটাল আর্থিক সেবার গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারছেন। অন্যদিকে গ্রাহকরাও নিজেদের ব্যবহূত ব্যাংক বা আর্থিক সেবার অ্যাপ থেকে একই কিউআর স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন।

বাংলা কিউআরের ব্যবহার বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মার্চেন্ট বা ব্যবসায়ীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া। ১ জুলাই একক কিউআর ব্যবস্থা চালুর দিনে দেশে বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ লাখ। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছেছে।

অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্টের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কিউআরভিত্তিক পেমেন্টের সুযোগ বাড়ছে।

ছোট দোকান, রেস্তোরাঁ, ফার্মেসি, সুপারশপ, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে কিউআর পেমেন্ট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ডিজিটাল লেনদেনের পরিধিও বাড়ছে। একটি নির্দিষ্ট কিউআর কোডের মাধ্যমে একাধিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব হওয়ায় ব্যবসায়ীদের জন্যও এই ব্যবস্থা তুলনামূলক সুবিধাজনক।

বাংলা কিউআর সম্প্রসারণে শুধু বেসরকারি ব্যাংক নয়, সরকারি ব্যাংকগুলোও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকগুলো নিজেদের গ্রাহকদের বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের এ ব্যবস্থার আওতায় আনতে কাজ করছে।

বিশেষ করে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বা সীমিত ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে কিউআর লেনদেনের পরিধি আরও বাড়তে পারে। এজন্য ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে মোবাইল আর্থিক সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও বাংলা কিউআরের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে মোবাইলভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এই বিশাল গ্রাহকভিত্তিকে একক কিউআর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়ার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশে এখনো দৈনন্দিন কেনাকাটা ও ব্যবসায়িক লেনদেনের বড় একটি অংশ নগদ অর্থনির্ভর। ফলে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বহন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়। ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার ঘটলে এই নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হতে পারে।

কিউআরভিত্তিক পেমেন্টের বড় সুবিধা হলো, এর জন্য আলাদা কার্ড মেশিন বা নগদ অর্থের প্রয়োজন হয় না। স্মার্টফোনে থাকা ব্যাংকিং বা আর্থিক সেবা অ্যাপ ব্যবহার করে কিউআর কোড স্ক্যান করেই পেমেন্ট করা যায়। ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও এটি তুলনামূলক কম খরচে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে।

ফলে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন বাড়ার অর্থ শুধু ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা বাড়া নয়; এটি দেশের সামগ্রিক পেমেন্ট অবকাঠামোর পরিবর্তনেরও একটি ইঙ্গিত।

একক কিউআর ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো একাধিক কিউআর কোডের প্রয়োজন কমে আসা। আগে বিভিন্ন ব্যাংক বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নিতে ব্যবসায়ীদের একাধিক কিউআর কোড রাখতে হতে পারত। এতে দোকানে কিউআর ব্যবস্থাপনা যেমন জটিল হতো, তেমনি গ্রাহকের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল।

বাংলা কিউআর এই সমস্যার একটি অভিন্ন সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করছে। একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবার গ্রাহকের কাছ থেকে পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগ থাকায় ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বড় হতে পারে। কারণ দেশের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল।

গ্রাহকের দিক থেকেও বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ার ফলে পেমেন্ট প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। কোনো দোকানে একটি অভিন্ন কিউআর কোড থাকলে গ্রাহক নিজের পছন্দের ব্যাংক বা আর্থিক সেবা ব্যবহার করে সেটি স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।

এতে পেমেন্টের ক্ষেত্রে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণও সহজ হয়। ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারণত অ্যাপ বা ব্যাংকিং সেবায় লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়, যা ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক হিসাব ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে।

তবে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকদের সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কিউআর স্ক্যান করার আগে ব্যবসায়ীর নাম, অর্থের পরিমাণ এবং লেনদেনের অন্যান্য তথ্য যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সন্দেহজনক কিউআর কোড বা অপরিচিত উৎসের পেমেন্ট অনুরোধের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলা কিউআরের বর্তমান প্রবৃদ্ধি দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুলাইয়ের শুরু থেকে অল্প সময়ের মধ্যে দৈনিক লেনদেন ৩৭ কোটি টাকার পর্যায় থেকে ১১০ কোটি টাকার বেশি হওয়া এবং মার্চেন্ট সংখ্যা ১৬ লাখ থেকে প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছানো দেখাচ্ছে যে ব্যবসায়ী ও গ্রাহক উভয়ের মধ্যেই এই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে শুধু কিউআর কোডের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট হবে না। সেবার নির্ভরযোগ্যতা, দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তি, নিরাপত্তা, গ্রাহক সচেতনতা এবং সব ব্যাংক ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বাংলা কিউআর পৌঁছে দিতে পারলে এর সম্ভাবনা আরও বাড়বে। বড় শহর ও বাণিজ্যিক এলাকার বাইরে ছোট বাজার, স্থানীয় দোকান ও বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানে কিউআর পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ানো গেলে ডিজিটাল লেনদেনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

‘এক দেশ এক কিউআর’ নীতির আওতায় বাংলা কিউআরকে বাধ্যতামূলক করার পর লেনদেনের দ্রুত বৃদ্ধি দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। দৈনিক লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার থেকে ৩ লাখ ৩ হাজারে এবং আর্থিক মূল্য ৩৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা থেকে ১১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় উন্নীত হওয়া এই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে একক কিউআর অবকাঠামো আরও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে নগদবিহীন লেনদেনের প্রবণতা দ্রুত বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জন্য পেমেন্ট গ্রহণ সহজ হবে এবং গ্রাহকদের সামনে তৈরি হবে আরও বিস্তৃত ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ। ফলে বাংলা কিউআর ভবিষ্যতে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামো হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।