রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

​​​​​​​নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৩:৫১, ১৯ আগস্ট ২০২৬

মহাসংকটে জাতীয় গ্রিড

​​​​​​​মহেশখালীতে ফের এলএনজি বিপর্যয়

​​​​​​​মহেশখালীতে ফের এলএনজি বিপর্যয়

ছবি সংগৃহীত

শিডিউল বিপর্যয় আর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সময়মতো জাহাজ না পৌঁছানোর মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশের গ্যাস খাতকে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল বুধবার দুপুরে টার্মিনালটির চাকা থমকে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এক ধাক্কায় ৬৫০ মিলিয়ন থেকে কমে মাত্র ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। গত ২১ জুলাই থেকে চলা টানা গ্যাস-সংকট এই নতুন ধাক্কায় এখন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও পেট্রোবাংলা বা আরপিজিসিএলের শীর্ষ কর্তাদের ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২৩ আগস্ট সিঙ্গাপুর থেকে একটি এলএনজিবাহী জাহাজ রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও তা কবে নাগাদ মহেশখালীতে ভিড়বে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। অন্যদিকে পেট্রোবাংলার ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, ডিজেল কিনে কারখানা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তাই দ্রুত গ্যাস না মিললে পুরোপুরি থমকে যাবে শিল্প উৎপাদন। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের মোট গ্যাসের ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশ সরবরাহ করে এলএনজি। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ কিংবা সরবরাহ কমে গেলেও সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহে এর বড় প্রভাব পড়ে। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল ২১ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহে চরম সংকটে পড়ে দেশ। এরপর এলএনজিবাহী জাহাজ না পেয়ে সামিটের টার্মিনালও এক দিন বন্ধ ছিল। সামিট চালুর পর এখন এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আবার বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও সংকটের দিকে যাচ্ছে।

তথ্য বলছে, বছরজুড়ে নির্ধারিত এলএনজি পেতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ওমান ও কাতার সরকারের পৃথক সরকারি পর্যায়ের (জিটুজি) দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং এলএনজি সরবরাহকারী দেশে হামলার কারণে চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনছে সরকার। অভিযোগ উঠেছে, গ্যাস সংকট সামাল দিতে সরকার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনলেও শিডিউল অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত এলএনজি দেশে পৌঁছাচ্ছে না। এ অবস্থায় দ্রুত এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জ্বালানিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন।

গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) তথ্যমতে, মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের মোট পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু এলএনজির অভাবে মঙ্গলবার বিকালেও যেখানে দুটি টার্মিনাল মিলে মাত্র ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল, বুধবার দুপুরে এক্সিলারেট বন্ধ

যাওয়ায় এখন কেবল সামিটের টার্মিনাল থেকে কোনোমতে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সোমবার যেখানে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ২৬২ মিলিয়ন ঘনফুট, তা বুধবার নামতে নামতে ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

দেশের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মেটানো হয় আমদানি করা এই এলএনজি দিয়ে। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়া মানেই গোটা দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোয় হাহাকার পড়ে যাওয়া। ইতোমধ্যে সিএনজি স্টেশন ও বাসাবাড়ির চুলার আঁচ নিমুখী। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শিল্প খাতে, বিশেষ করে ডাইং ও ইস্পাত কারখানায়।

জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামপ্রতিক সংকট শুধু সাময়িক সরবরাহ সমস্যার বিষয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার পর আমদানিকৃত এলএনজির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা এখন বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

একদিকে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, অন্যদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের প্রায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে, আর শহর থেকে গ্রামে বেড়ে চলেছে লোডশেডিং। গ্যাস সংকটের এ প্রভাব সরাসরি পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। জ্বালানির অভাবে অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বিদ্যুৎ ঘাটতি কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সামপ্রতিক সময়ে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি ছাড়িয়েছে। তবে গ্যাসের মোট সরবরাহ কমলেও লোডশেডিং কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এমন বাস্তবতায় বিকল্প উপায়ে চড়া দামে ডিজেল পুড়িয়ে কারখানা চালু রাখা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা।

বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিদেশের ক্রেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বাধ্য হয়ে লাইট ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখতে হয়েছিল। কিন্তু গ্যাসের চেয়ে চারগুণ বেশি দামি জ্বালানি পুড়িয়ে রড বানালে তার তৈরি খরচ আকাশ ছোঁবে। বাজারে সেই পণ্য টিকবে কীভাবে? আমরা চূড়ান্ত দুশ্চিন্তায় আছি, আগামী দিনগুলোয় কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।’

অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে গ্রামীণ এলাকায়। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাভুক্ত অঞ্চলে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের কারণে জন-অসন্তোষ বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, পরিবহন ও শিল্প খাতও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতে কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে রাতদিন। অনেক সিএনজিচালিত যান ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি পাচ্ছে না। এতে গণপরিবহন সংকট, ভাড়া বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আলোকসজ্জা ও বিজ্ঞাপন বোর্ডের ব্যবহারও সীমিত করা হয়েছে। বুধবার রাতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করেন কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মো. আরমান ভূঁইয়া এবং বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিফাত বিনতে আরা।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে সহায়ক হলেও দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই। সামপ্রতিক সংকট প্রমাণ করেছে, দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি মাত্র উৎস বা অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বেশ আগেই আমদানিনির্ভর হয়ে গেছে। এটি না হলে হয়তো আজ এমন সংকট হতো না। তবে দুর্নীতি, লুণ্ঠন বন্ধ করলে আর্থিক চাপ তৈরি হতো না। এছাড়া আমদানি ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক হলেও সংকট এড়ানো সম্ভব। আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবহার করতে হবে। কয়লা আমদানি না করে জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ বাড়বেই।