ঢাকা ডিভিশনে রেল চলাচল ঝুঁকিতে
৪৬টি ট্রাকশন মোটর ঘাটতি নিয়েই ছুটছে ইঞ্জিন
ছবি সংগৃহীত
ঢাকা ডিভিশনে লোকোমোটিভের (রেল ইঞ্জিন) মারাত্মক যান্ত্রিক সংকট দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় ৪৬টি ট্রাকশন মোটর ঘাটতি নিয়েই প্রতিনিয়ত ঝুঁকি সামলে চালাতে হচ্ছে ট্রেন। এ বিষয়ে জরুরি প্রতিকার ও লোকোমোটিভ মেরামতের জন্য রেল ভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার লিখিত আবেদন জানানো হলেও এখন পর্যন্ত মেলেনি কোনো কার্যকর সুরাহা।
ঢাকা বিভাগে ৪৬টি ট্রাকশন মোটরের ঘাটতির ফলে অন্যান্য মোটরের ওপর অতিরিক্ত লোড পড়েছে। এর ফলে যেকোনো সময় লোকোমোটিভ মাঝপথে বিকল হয়ে ট্রেন চলাচল বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি বড় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ রেলের বিশেষজ্ঞরা।
রেল বিশেষজ্ঞরা জানান, চলন্ত অবস্থায় হুট করে ট্রাকশন মোটর ফেইল করলে বা চাকা লক হয়ে গেলে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া মোটরের ওপর অতিরিক্ত চাপ অব্যাহত থাকলে লোকোমোটিভের মূলবান যন্ত্রাংশ চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং যা মেরামত করতেও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব খরচ বাড়ছে।
রেলের এক নথিতে দেখা যায়, ঢাকা-বেইজড (২৯০০, ২৩০০ ও ২৪০০) সিরিজের ২৩টি লোকোমোটিভে মোট ৪৬টি ট্রাকশন মোটর ঘাটতি অবস্থায় আছে এবং (২৩০০ ও ২৪০০) সিরিজের ১২টি লোকোমোটিভের কোনোটিতে কোনো মোটর কার্যকর নেই। আরও তিনটি লোকোমোটিভ (২৩১২, ২৩১৮ ও ২৪০১) সিরিজের চারটি করে মোটর কার্যকর আছে।
এছাড়া ছয়টি লোকোমোটিভে (২৩০৭, ২৩১৬, ২৩১৯, ২৩২২, ২৪০৩ ও ২৪১১) সিরিজের তিনটি করে ঘাটতি নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ট্রেন চলছে। ২৩০১-এর চারটি মোটর ঘাটতি ও ২৩১১-এর ছয়টি মোটর ঘাটতি অবস্থায় আছে। ২৯০০ সিরিজের ১১টি লোকোমোটিভে মাত্র চারটিতে সব মোটর সচল রয়েছে বলে জানা যায়।
রেল সূত্রে জানা যায়, এসব লোকোমোটিভের বেশ কয়েকটির জেনারেটও অনেক পুরোনো হয়ে গেলেও সেসব মেরামত করতে পারেনি বাংলাদেশ রেলওয়ের বিশেষ করে ২৩/২৪ সিরিজের এবং ছয় বছর পরপর একটা করে লোকোমোটিভ ভারি মেইনটেন্যান্স করার কথা থাকলেও নাকি সেটা করা হয়নি।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভের সংকট দীর্ঘদিনের। বর্তমানে অর্ধেকেরও বেশি ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয় ও ট্রেন বাতিল দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে এই সংকট কাটাতে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অদক্ষতা এবং একধরনের ‘দায় এড়ানোর সংস্কৃতি’কে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক শেয়ার বিজকে জানান, রেলের অপারেশনের সঙ্গে যারা জড়িত তারা জানেন, কয়টা রুটে ট্রেন চালাতে হয়। তারা জানেন, প্যাসেঞ্জার ট্রেন কয়টা, ফ্রেইড ট্রেন কয়টা, লাইনের ক্যাপাসিটি কত, রোলিংস্টকের স্টক এন্ট্রি রেলের অপারেশন বিভাগের কাছে তথ্য থাকার কথা। কেন প্রতিনিয়ত চিঠি দিয়ে লোকোমোটিভ চাইতে হবে? যদি রেলের অপারেশন বিভাগের কাছে এসব তথ্য থাকতো তবে পরিকল্পিত উন্নয়ন হতো।
অধ্যাপক শামসুল হক আরও বলেন, রেল শুধু নজর দিয়েছে কথিত অবকাঠামো উন্নয়নের এবং যেটা সবচেয়ে সহজ কাজ। গণমানুষের সেবা দেওয়ার জন্য যে রোলিংস্টকের লোকোমোটিভ লাগে, কমপার্টমেন্ট লাগে, সেদিকে তারা সিনক্রোনাইজড ওয়েতে নজর দেয়নি। অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ হয়েছে। সেই বিনিয়োগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডি বাস্তবায়িত হলে কী বেনিফিট হবে, জনগণের সেটা কিন্তু জনগণ পায়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, শুধু রেলের অবকাঠামো উন্নয়ন করলে হবে না। সেবা দিতে গেলে অবশ্যই রেলে রোলিংস্টক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রেল একটা পেশাদারিত্বের জায়গা। কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব হওয়া উচিত ছিল। সেইসঙ্গে অবকাঠামোর কত দিনের মধ্যে শেষ হবে, এটাকে মাথায় রেখে যেন রোলিংস্টক প্রস্তুত থাকে, সেটা বিবেচনা করা। কিন্তু তারা পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারেননি, দায়িত্ব থাকলেও দায় এড়িয়ে গেছেন।
অধ্যাপক শামসুল হক আরও বলেন, কাউকে চাহিদা দিতে হবে! চাহিদা দিলে প্রকিউরমেন্ট লেগে যায় তিন-চার বছর। এভাবে তো হোঁচট খেয়ে রেল চলতে পারে না। সুতরাং কর্মকর্তাদের আরও দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। বর্তমান সরকারকে রেলের অবকাঠামো উন্নয়নের আগে অপারেশনাল ক্যাপাসিটির ঘাটতি থাকলে সেটা আদায় করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে সবচেয়ে সহজ কাজটি করার জন্য আগ্রহী হয়। আর জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য যে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেদিকের প্রতি নজর থাকে না। প্রকিউরমেন্ট ঢিলে হয়ে যায়। পরিকল্পনা কমিশন দেশের উন্নয়নে প্রত্যকটা প্রকল্পকে যোগ্য মনে করে ছাড়পত্র দেয়, একনেকে নিয়ে যায়। তারা যেন এই প্রশ্নগুলো করে যে, আগের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, ফিজিবিলিটি স্টাডি অনুযায়ী জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না, কারণ রোলিংস্টকে সংস্থান নেই। সেই হিসেবে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যেতে পারে, তাহলে রেল অন্তত কিছুটা হলেও অপারেশনাল সাইডটা দেখবে। উন্নয়নের চাহিদায় টাকা চলে গেলে তখন টাকা ঘাটতি হয়ে যাবে। এই উন্নয়ন দিয়ে সেবা দেয়া যাবে না। বরং বড় ভর্তুকির মধ্যেই থাকবে রেল। রোলিংস্টকের ঘাটতি থাকলে রেভিনিউ আসবে না। সুতরাং সরকার ও প্লানিং কমিশনের উচিত হবে রেলের কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতার মধ্যে আনা। আর না হলে এই প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের সহজ কাজেই বেশি মনোযোগী হবে। জনগণের সেবা দেয়ার জন্য যে সমান্তরাল কাজগুলো করা দরকার সেখানে অবহেলা থেকেই যাবে।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন রেলের কর্মর্তারা। তাদের প্রধান দাবি—প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ বা পার্টস পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে সচল করা যাচ্ছে না অকেজো ইঞ্জিনগুলো এবং নিয়মিত মেরামতের জন্য বার্ষিক বাজেটের ঘাটতিকে সামনে আনছেন। এছাড়া মেকানিক, প্রকৌশলী ও দক্ষ লোকোবলের (ইঞ্জিনিয়ারিং ক্রু) অভাব দেখিয়ে মেরামত কাজ আটকে রাখার কথা বলছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে রেলের জেডিজি (লোকো) যুগ্ম মহাপরিচালক মো. বোরহান উদ্দিন এবং এডিজি (আরএস) অতি. মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীনকে একাধিকবার ফোন দিলে ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র শেয়ার বিজকে জানান, ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জ বাজার (ভায়া গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুর) যেত এই রেল। এই অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ এবং ছোট ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহনের জন্য ট্রেনটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল। এটি বন্ধ হওয়ায় বর্তমানে এই রুটের যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তারা বলছেন, নতুন লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন বহরে যুক্ত হওয়া এবং লোকবল সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত ট্রেনটি আবার চালুর সম্ভাবনা কম।
রেল সূত্রে জানা যায়, ২৩০০ ও ২৪০০ সিরিজের লোকোমোটিভগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুস্কাল এবং কার্যকাল ইতোমধ্যে ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে। এই সিরিজির লোকোমোটিভে বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি বিদ্যমান থাকায়, সেইসঙ্গে বর্তমানে মোটর ঘাটতি থাকায় সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ট্রেন চলছে।
এছাড়া ৫৫ ভাওয়াল এক্সপ্রেস গত ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল এবং ৫৬ নাম্বার ভাওয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ১ মে থেকে একেবারে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ২৬১/২৬২/২৬৩/২৬৪ মোহনগঞ্জ লোকাল ট্রেন গত ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে লোকোমোটিভের অভাবে। সেইসঙ্গে ৩৯/৪০ নাম্বার ঈশা খাঁ ২০২০ সালের ১২ মার্চ থেকে একেবারে বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ইস্টার্ন জোনে দীর্ঘদিন ধরে চলা ইঞ্জিন সংকটের কারণে এই লোকাল ও মেইল ট্রেনটি বন্ধ করা হয়। ভাওয়াল এক্সপ্রেসে ব্যবহূত ২৩০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো অত্যন্ত পুরোনো (কানাডা থেকে ১৯৬৯ সালে কেনা) ছিল, যেগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ৩০-৩৫ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। প্রায়ই মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার কারণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ট্রেনটি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।
যদিও ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময় এবং ২০২৫ সালের শুরুতে (যেমন ১ জানুয়ারি, ২০২৫) বিভিন্ন কারণে সাময়িকভাবে ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করা হয়েছিল, তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ রেলওয়ে এক আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে ভাওয়াল এক্সপ্রেসকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করে। বর্তমানে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ট্রেনটি আবার চালু করার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ৪৬টি ট্রাকশন মোটর সংগ্রহ ও সংযোজনের উদ্যোগ নিতে হবে। অতি-ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনগুলোর ওপর অবিলম্বে কারিগরি পরিদর্শন চালিয়ে সাময়িকভাবে সেগুলোর সার্ভিস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন এবং রেলের রক্ষণাবেক্ষণ খাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ দিয়ে স্পেয়ার পার্টস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে ঢাকা বিভাগের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
লোকোমোটিভের ঘাটতি ট্রাকশন মোটর জরুরি ভিত্তিতে শপে সংযোজনের পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সুষ্ঠু ও নিরাপদ ট্রেন পরিচালনার জন্য রেলের এডিজি (আরএস), জেডিজি (লোকো), পরিচালক (এলএম), বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ রেলওয়ে, রেলভবন, ঢাকা এবং প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (পূর্ব), বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রামকে উল্লেখ করে চিঠি দিলেও তার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানা যায়।