বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

ড. মতিউর রহমান

প্রকাশ: ১৯:১১, ২৭ জুলাই ২০২৬

লাইন কি শুধু অপেক্ষা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপেক্ষার পুঁজিবাদের অন্দরমহল

লাইন কি শুধু অপেক্ষা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপেক্ষার পুঁজিবাদের অন্দরমহল

ছবি সংগৃহীত

বর্তমান ভোগবাদী এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে আমরা প্রতিদিনের জীবনে এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি হই। বিভিন্ন বাণিজ্যিক বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, যেমন সুপারমার্কেট, শপিং মল, ব্যাংক, হাসপাতাল, সরকারি অফিস কিংবা টিকিট কাউন্টারে সেবা গ্রহণ করার পর অর্থ পরিশোধ বা চূড়ান্ত ধাপের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এটি এমন এক দৃশ্য, যা বাংলাদেশের প্রতিটি শহরেই অতিপরিচিত।

অথচ আধুনিক প্রযুক্তি এবং অটোমেশন এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন হাতের নাগালে। স্বয়ংক্রিয় বিলিং সিস্টেম, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে এবং ডিজিটাল অ্যাপের মতো সুবিধাগুলো থাকা সত্ত্বেও কেন এই সীমাহীন অপেক্ষা? কেন ১০টি ক্যাশ কাউন্টারের মধ্যে মাত্র দুটি বা তিনটি খোলা থাকে? এই প্রশ্নের গভীরে প্রবেশ করলেই বেরিয়ে আসে এক অদৃশ্য শোষণের চিত্র, যা সমাজতাত্ত্বিক ইভা ইলুজের ‘আবেগীয় পুঁজিবাদ’-এর মতোই। এখানে আমাদের সময়, ধৈর্য ও শ্রমকে একটি মুনাফামূলক পণ্যে পরিণত করা হয়। এই অদৃশ্য প্রক্রিয়াটিই হলো অপেক্ষার পুঁজিবাদ।

অপেক্ষার পুঁজিবাদ একটি জটিল ধারণা, যা নিছক সময় নষ্টের চেয়েও গভীর। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক কৌশল যেখানে ভোক্তার অপেক্ষাকে এক ধরনের অদৃশ্য সম্পদে পরিণত করা হয়, যা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মুনাফা নিয়ে আসে। এ ধারণাটি বিশ্লেষণ করেছেন প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভে, গিওর্গিও আগামবেন এবং মাইকেল হার্ট ও আন্তোনিও নেগ্রির মতো সমালোচক তাত্ত্বিকরা।

ডেভিড হার্ভে, তার ‘দ্য এনিগমা অব ক্যাপিটাল’ এবং ‘সেভেনটিন কন্ট্রাডিকশনস অ্যান্ড দ্য এন্ড অব ক্যাপিটালিজম’ গ্রন্থে পুঁজিবাদের অধীনে সময়ের ধারণা কীভাবে বিকৃত হয়, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, পুঁজিবাদ কেবল শ্রম এবং পণ্যই শোষণ করে না, বরং মানুষের ব্যক্তিগত সময়কেও পুঁজির উৎপাদনের একটি উপকরণে পরিণত করে। অপেক্ষার মাধ্যমে যে সময় ব্যয় হয়, তা পুঁজিবাদের দৃষ্টিতে কোনো ‘নষ্ট সময়’ নয়, বরং এটি একটি সক্রিয় বিনিয়োগ, যা প্রতিষ্ঠানের খরচ কমিয়ে লাভের হার বাড়াতে সাহায্য করে। অর্থাৎ যখন আমরা লাইনে দাঁড়াই, আমাদের অলস সময়টি প্রতিষ্ঠানের জন্য কম কর্মী দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

গিওর্গিও আগামবেন, তার ‘হোমো সাসের’ গ্রন্থে মানবজীবনকে যেভাবে সিস্টেমের মধ্যে একটি ‘বেয়ার লাইফ’ বা নিছক অস্তিত্বে পরিণত করা হয়, তার সঙ্গে অপেক্ষার এই প্রক্রিয়াকে তুলনা করা যেতে পারে। মানুষের সময় এখানে তার নিজের হাতে থাকে না, বরং সিস্টেমের চাহিদা অনুযায়ী তা ব্যবহার করা হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি কেবল একটি দেহপিণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়, যার ব্যক্তিগত সময়, আকাঙ্ক্ষা বা মূল্যবোধের কোনো গুরুত্ব নেই। তার একমাত্র কাজ হলো সিস্টেমের অংশ হিসেবে অপেক্ষা করা।

মাইকেল হার্ট এবং আন্তোনিও নেগ্রি তাদের ‘এম্পায়ার’ এবং ‘মাল্টিটিউড’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন—কীভাবে আধুনিক পুঁজিবাদ কেবল বস্তুগত উৎপাদন নয়, বরং অ-বস্তুগত শ্রমকেও শোষণ করে। অপেক্ষার মাধ্যমে যে ধৈর্যের পরীক্ষা হয়, তা এক ধরনের অ-বস্তুগত শ্রম। এটি মস্তিষ্কের পরিশ্রম, মানসিক শক্তি ব্যয় এবং ধৈর্যের অনুশীলন, যার কোনো আর্থিক প্রতিদান নেই, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি মূল্যবান। এই নীরব পরিশ্রমের মাধ্যমে, প্রতিষ্ঠানগুলো জনবল খরচ বাঁচিয়ে তাদের মুনাফা বাড়ায়। অপেক্ষার পুঁজিবাদ তাই কেবল একটি অর্থনৈতিক মডেল নয়, এটি একটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল, যা মানুষকে সিস্টেমের প্রতি আনুগত্যশীল করে তোলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজধানী ঢাকার একটি আধুনিক সুপারশপে প্রবেশ করলেই আমরা অপেক্ষার পুঁজিবাদের একটি জীবন্ত চিত্র দেখতে পাই। ১০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যাশার মেশিন থাকা সত্ত্বেও সক্রিয় থাকে কেবল চারটি বা পাঁচটি। বাকি মেশিনগুলো বন্ধ পড়ে থাকে, যেন এগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। হাজার হাজার ভোক্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে শুধু বিল পরিশোধের জন্য। এটি কেবল অযৌক্তিক মনে হলেও, এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক যুক্তি কাজ করে—কম জনবলে বেশি কাজ করানো।

এক্ষেত্রে সুপারশপগুলো কর্মীদের বেতন, মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং অবকাঠামোগত ব্যয় সাশ্রয় করে। এর ফলে একটি লাইন যত দীর্ঘ হয়, প্রতিষ্ঠানের লাভ তত বৃদ্ধি পায়। ভোক্তাদের এই দীর্ঘ অপেক্ষা তাদের নিজস্ব সময়ের মূল্যকে অবমূল্যায়ন করে এবং তারা অজান্তেই প্রতিষ্ঠানের লাভজনকতার অংশীদার হয়ে পড়ে।

অপেক্ষার এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি অর্থনৈতিক কৌশল নয়, এটি সামাজিক বৈষম্যকেও উসকে দেয়। অনেক সুপারশপ বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ‘ভিআইপি’ বা ‘প্রধান কাস্টমার’-এর জন্য আলাদা কাউন্টার রাখা হয়। এর ফলে অপেক্ষার চাপ দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর আরও বাড়ে, কারণ তাদের জন্য অপেক্ষার লাইন আরও দীর্ঘ হয়। এই পদ্ধতিটি কেবল অর্থের বিনিময়ে সুবিধার বণ্টন নয়, এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অবদমন, যেখানে উচ্চবিত্তরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারে এবং নিম্নবিত্তরা তাদের অধস্তনতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। অপেক্ষার এই বিভাজন শ্রেণিবৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে এবং সমাজে একটি নীরব উত্তেজনা তৈরি করে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে অপেক্ষার পুঁজিবাদ একটি অতি পরিচিত ঘটনা। ব্যাংকগুলোয় টাকা জমা বা উত্তোলনের অভিজ্ঞতা প্রায়ই দীর্ঘ লাইনের মুখোমুখি হওয়ার সমার্থক। যেখানে কমপক্ষে আটটি বা ১০টি কাউন্টার থাকা উচিত, সেখানে সচল থাকে মাত্র পাঁচটি বা ছয়টি। এর ফলে অপেক্ষমাণ মানুষের লাইন দীর্ঘ হয় এবং পেছনে অনুপস্থিত যন্ত্র বা জনবল অপ্রকাশ্য লাভের হিসাবকে দৃশ্যমান করে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক মূলত নিম্নলিখিত কৌশলগুলো অবলম্বন করে—

খরচ সাশ্রয়: কম জনবল দিয়ে কাজ চালানো হয়, যার ফলে কর্মীদের বেতন বাবদ খরচ কমে।

মুনাফা বৃদ্ধি: যে জনবলকে অন্যত্র ব্যবহার করা যেত, তাদের অপেক্ষার মাধ্যমে ‘ভার্চুয়ালি’ নিয়োগ করা হয়। অর্থাৎ মানুষ নিজের সময় ব্যয় করে ব্যাংকের কাজ সম্পন্ন করছে, যার জন্য তারা কোনো মজুরি পাচ্ছে না।

সাশ্রয়ী প্রশাসন: কর্মীসংখ্যা হ্রাসের মাধ্যমে ব্যাংক এক ধরনের ‘সাশ্রয়ী প্রশাসন’ চালায়, যা তাদের অপারেটিং খরচ কমায় এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করে।

এ কাঠামোটি এক ধরনের মার্কেটাইজড সময় তৈরি করে, যেখানে সময়কে অর্থে রূপান্তর করা হয় সেবাগ্রহীতার অজান্তেই। মানুষকে ধীরে ধীরে শেখানো হয়, অপেক্ষা করাই নিয়ম এবং যদি আপনি অপেক্ষা করতে না চান, তাহলে ‘প্রিমিয়াম সেবা’ কিনুন।

এটি একটি আকর্ষণীয় ফাঁদ: যারা অর্থ ব্যয় করতে পারে, তারা লাইনের বাইরেও দ্রুত সেবা পায়। যেখানে দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি অপেক্ষার গ্লানি বইতে বাধ্য হয়। এটি একটি স্পষ্ট শ্রেণি বিভাজন তৈরি করে, যেখানে সময় নামক সম্পদটি অর্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হয়। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অসংখ্য ব্যাংকের শাখায় নিত্যদিনের চিত্র।

হাসপাতালগুলোয় বিশেষ করে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায়, অপেক্ষার পুঁজিবাদের চিত্র আরও প্রকট ও নির্মম। একজন রোগী বা তার আত্মীয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে কেবল কাউন্টারে পেমেন্ট বা রিপোর্ট নেওয়ার জন্য। অথচ প্রতিষ্ঠানটির কাছে আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত জনবল থাকলেও, সীমিতসংখ্যক ক্যাশ পয়েন্ট বা কাউন্টার সচল রাখা হয়, যেন অপেক্ষা নিজেই একটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত হয়।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা একজন রোগীকেও এই অপেক্ষার যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করে। একটি দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও শুধু বিলিং বা অ্যাডমিশন প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা রোগীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা যেতে পারে ‘বিকল্প ব্যয়মূল্য-ভিত্তিক শোষণ’, যেখানে সময় হারানো এবং ধৈর্যের শ্রম প্রদান হচ্ছে একজন নাগরিকের অদৃশ্য অবদান, কিন্তু যার প্রতিদান নেই।

হাসপাতালগুলো এই কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের অপারেটিং খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়ায়। কম সংখ্যক কর্মীর মাধ্যমে কাজ করিয়ে নেয়া হয় এবং অপেক্ষার মাধ্যমে রোগীদের ‘ধৈর্যের শ্রম’কে ব্যবহার করা হয়। এটি স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকারকেও বাণিজ্যিকীকরণের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরে, যেখানে মানবজীবনের মূল্য মুনাফার অঙ্কের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। অনেক সময় জরুরি বিভাগের রোগীদেরও অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা তাদের শারীরিক কষ্ট বাড়িয়ে তোলে।

তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সত্ত্বেও অপেক্ষার এই পুঁজিবাদ আরও শক্তিশালী হয়েছে। অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং, ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম—এসব থাকা সত্ত্বেও জনগণকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এর কারণ হিসেবে প্রায়ই ‘যান্ত্রিক অসুবিধা’ কিংবা ‘সিস্টেম ডাউন’-এর মতো অজুহাতগুলো দেখানো হয়, যা একটি গ্রহণযোগ্য সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ অজুহাতগুলো প্রায়ই একটি কৃত্রিম পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের জনবল ও অবকাঠামো খরচ বাঁচিয়ে মুনাফা বাড়ায়।

আসলে এগুলোর পেছনে আছে একটি সূক্ষ্ম কৌশল: অপেক্ষা তৈরি করে দেয় এক ধরনের ‘সহনশীল শৃঙ্খলা’, যা মানুষকে প্রশ্নহীন, নীরব ও ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যশীল করে তোলে। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে মানুষ যেন শিখে নেয়—‘প্রতিষ্ঠানের সময়ই আসল সময়, আমার সময়ের কোনো মূল্য নেই।’ এটাই অপেক্ষার পুঁজিবাদের মৌলিক দর্শন। এই নীরব সম্মতি এবং সহনশীলতা পুঁজিবাদের এই শোষণকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, কারণ নাগরিকরা তাদের নিজস্ব সময় এবং শ্রমের মূল্য সম্পর্কে সচেতন হয় না এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলে। ডিজিটাল যুগেও যখন মানুষকে অকারণে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে শ্রমের দাম কম এবং সময়ের মূল্যায়ন নেই, সেখানে এই কাঠামো আরও গভীর ও সুসংহত। ভোক্তারা এই ব্যবস্থাকে মেনে নেয়, প্রতিরোধ না করে। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং ক্ষমতাহীনতার এক অদৃশ্য জাল। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সমাজে ধৈর্যের গুণকে বিশেষ মূল্য দেওয়া হয়। ‘ধৈর্য ধরলে ফল মিলবে’ বা ‘সবুরে মেওয়া ফলে’—এরকম প্রবাদ আমাদের সংস্কৃতির অংশ। এই সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো এই অর্থনৈতিক শোষণের একটি শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে কাজ করে, কারণ মানুষ অসীম ধৈর্য ধারণ করতে অভ্যস্ত।

এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত আছে, প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বা ব্যবস্থার ত্রুটিকে প্রশ্ন করা অর্থহীন। এই মানসিকতা মানুষকে আরও বেশি নিষ্ক্রিয় করে তোলে। ক্ষমতার ভারসাম্যের অভাব এবং প্রতিবাদ করার সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় এই অপেক্ষার পুঁজিবাদ আরও দৃঢ়ভাবে শিকড় গেড়েছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ও মানসিক নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি। এটি মানুষের মধ্যে এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি করে, যেখানে তারা মনে করে যে এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা নিরর্থক। এই সহনশীলতা আমাদের সমাজকে অপেক্ষার পুঁজিপতিদের জন্য একটি উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছে।

সুপারমার্কেট থেকে ব্যাংক, হাসপাতাল থেকে রিটেইল আউটলেট—সবখানে ‘কম জনবল, সীমিত যন্ত্র, দীর্ঘ লাইন’ হলো একটি কৌশলগত পুঁজিবাদী নকশা। এর মাধ্যমে ভোক্তার সময়, ধৈর্য এবং অসহায়তা পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়। এই অদৃশ্য শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হলে দরকার সামাজিক সচেতনতা, প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহার এবং নাগরিক অধিকার সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া। আমাদের বুঝতে হবে, আমাদের সময় এবং শ্রমের একটি অন্তর্নিহিত মূল্য আছে, যা অকারণে শোষিত হতে দেওয়া উচিত নয়।

আমাদের এই নীরব সম্মতি ভাঙতে হবে এবং নিজেদের সময়ের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে হবে। সরকারের উচিত এ ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় পর্যাপ্ত জনবল এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা। নাগরিক সমাজকেও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং ভোক্তাদের তাদের অধিকার সম্পর্কে অবগত করতে হবে। তা না হলে আমরা কেবল দাঁড়িয়ে থাকব একটি লাইনে, যা কোথাও যায় না, শুধু আমাদের আরও বেশি করে পুঁজিবাদের অদৃশ্য জালে জড়িয়ে ফেলে। আমাদের ব্যক্তিগত সময়কে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রক্রিয়াকে রুখতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।

গবেষক ও উন্নয়নকর্মী