একটি ব্যাংক কীভাবে ভালো গ্রাহক পেতে পারে
ছবি সংগৃহীত
বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাত এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, গ্রাহকের চাহিদা এবং তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ। এখন আর শুধু গতানুগতিক ব্যাংকিং সেবা দিয়ে গ্রাহক ধরে রাখা সম্ভব নয়। বর্তমান সময়ে গ্রাহকের চাওয়া দ্রুত, নিরাপদ এবং স্বনির্ভর সেবা, যা তাদের দ্রুত লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে। পাশাপাশি, তারা এমন ব্যাংককে পছন্দ করে যারা অন্য সবার তুলনায় একটু হলেও ভিন্ন।
ধরা যাক, জনাব ফরহাদ একজন চাকরিজীবী। তিনি একটি করপোরেট অফিসে চাকরি করেন। অফিসের কাজের শত ব্যস্ততার মধ্যে তাকে বাসাভাড়া, বিভিন্ন প্রকার বিল, মোবাইল রিচার্জ, অনেক জনকে বিভিন্ন কাজের টাকা দেওয়া এবং অফিসের কাজের জন্য দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করতে হয়। যদি তাকে এসব কাজ ব্যাংকে গিয়ে করতে হয়, তবে তার অনেক সময় নষ্ট হবে, যা তার হাতে নেই। কিন্তু যদি তিনি একটি অ্যাপ বা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এক জায়গায় বসে সব কাজ সম্পাদন করতে পারেন, তবে তিনি কাকে বেছে নেবেন?
এসব প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলো তাদের সেবার ধরন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার কৌশলগুলো নতুনভাবে সাজাতে শুরু করেছে। কীভাবে গ্রাহক আকর্ষণ করা যায় এবং তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, যেমন ডিজিটাল ব্যাংকিং, নতুন নতুন সেবা, সামাজিক কর্মসূচি (CSR) মাধ্যমে গ্রাহকের সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টিগুলো ব্যাংকগুলোকে ভবিষ্যতে তাদের বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সহায়তা করবে।
ব্যাংক খাত ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ রূপ পরিবর্তন করেছে। মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল ওয়ালেট, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহক যে কোনো স্থান থেকে সহজে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে সক্ষম। কমে এসেছে তথাকথিত শাখা নির্বাচন সেবা এবং নির্দিষ্ট সময়ে ব্যাংকিং করতে হয় না গ্রাহকদের। চাহিদা এখন ২৪/৭ সেবা, দ্রুত লেনদেন এবং নিরাপদ ব্যাংকিং।
যদি বলি, ব্যাংকিং ফিনটেক স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল-ওনলি ব্যাংকিং জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তবে এটি প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করেছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুফল বাংলাদেশেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং গত কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল প্রসারের জন্য বিশেষভাবে কাজ করছে।
এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ডিজিটাল সেবা প্রদান করতে হবে। আধুনিকায়ন যাতে করে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ হয় এবং ব্যাংক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে।
কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যে গ্রাহকরা তথ্যপ্রযুক্তিতে বেশি সক্ষম, তাদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। গ্রাহক এখন আর ব্যাংকে এসে বসে সেবা নিতে আগ্রহী নয়। তারা এমন সেবা চায়, যা তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে। তারা আর সাধারণ ব্যাংকিং পণ্য চায় না, তারা এমন সেবা চায় যা তাদের জীবন চলার পথ সহজ করবে। গ্রাহকরা বর্তমানে পরিবেশগত এবং সামাজিকভাবে সচেতন হয়ে উঠেছে এবং মূল্যবোধ ধারণ করে ব্যাংকিং করতে চায়। যেমন সম্প্রতি বাংলাদেশে চালু হয়েছে গুগল পে, যা গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করেছে।
ব্যাংক খাতে প্রবেশ করেছে বিকল্প অনেক প্ল্যাটফর্ম এবং গ্রাহকরা তাদের ব্যাংকিং সেবার জন্য বিকল্প পাচ্ছেন। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো কেবল তাদের সেবা নয়, বরং গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করছে। একজন ব্যাংকার হিসেবে, ভালো মানের গ্রাহক নিতে চাইলে সময়ের সঙ্গে মানানসই ব্যাংকিং সেবা দিতে হবে এবং জানাতে হবে সেবা ও তার উপকারিতা সম্পর্কে। বর্তমান সময় ব্যাংকগুলোর জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ মানুষ বেশির ভাগ সময় অনলাইনে থাকে। এজন্য শক্তিশালী ডিজিটাল মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। যদি একটি ব্যাংকের সব ধরনের তথ্য, সেবা এবং হিসাব-নিকাশ ওয়েবসাইটে থাকে, তাহলে একজন গ্রাহক ঘরে বসে ব্যাংক সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন। সোশ্যাল মিডিয়া এখন সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম, তাই ব্যাংকগুলো যদি তাদের সেবা বা নতুন অফারগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করে, তাহলে গ্রাহক পাওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী বিদেশে পড়াশোনা করতে যায়। স্টুডেন্ট ফাইল তাদের জন্য একটি সমস্যার কারণ, অধিকাংশ শিক্ষার্থী জানে না কীভাবে স্টুডেন্ট ফাইল ওপেন করতে হয়। আর যদি এ তথ্যগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করা হয়, তবে দেখা যাবে অধিক সংখ্যক স্টুডেন্ট ফাইল নিজের ব্যাংকেই খোলা হচ্ছে। এছাড়া এসইও, পেইড ক্যাম্পেইন ব্যবহার করা যেতে পারে।
ব্যাংকার যাকে সেবা দিচ্ছেন, সে হলো সবচেয়ে বড় মার্কেটিং মাধ্যম। যে গ্রাহক ব্যাংকের সেবা মাধ্যমে সন্তুষ্ট হয়, সে অন্যদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আসতে উৎসাহিত করবে। এজন্য যিনি যে ডেস্কে কাজ করুন না কেন, নিজের সেবার মান হতে হবে ভালো। কারণ, একজন ব্যাংকার ১০০ জনের কাছে যেতে পারেন, কিন্তু তার কাছ থেকে সেবা নেওয়া ওই গ্রাহকের একটি রেফারেন্স তারা ব্যাংক নিয়ে আসতে পারে হাজার হাজার গ্রাহক। এই পদ্ধতিতে ব্যাংকার পাবেন উচ্চমানের গ্রাহক এবং গ্রাহক ধরে রাখার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
গ্রাহক আকর্ষণের একটি কার্যকরী প্রচলিত মাধ্যম হলো বিভিন্ন প্রকার অফার বা প্রমোশনাল অফার। এতে করে গ্রাহক নতুন পণ্য নিতে আগ্রহী হয়। যেমন করপোরেট অফিসের ফাহাদ সাহেবের কথা, তার অ্যাকাউন্ট থেকে বিদ্যুৎ বিল প্রদান করে, যদি বিদ্যুৎ বিলের চার্জ ফ্রি পান, অথবা ওই ব্যাংকে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিমান ভাড়া ১০ শতাংশ কম পান, তাহলে তিনি ক্রেডিট কার্ড নেবেন। এছাড়া ক্যাশ বোনাস, বিশেষ অফার, দীর্ঘমেয়াদি অফার, যা গ্রাহকের প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করে।
একটি ব্যাংক ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়, তবে ওই স্কুল বা এলাকার মানুষের মধ্যে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ব্যাংকগুলো চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে এই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। এছাড়া আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে আর্থিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে, যা ব্যাংকের ব্র্যান্ড পরিচিতি বাড়াবে।
আধুনিক ব্যাংক খাতে নতুন গ্রাহক আকর্ষণ এবং প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম হলো অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। যেমন একজন গ্রাহক যদি একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রাখেন, তবে তিনি কিছু প্রতিষ্ঠানের পণ্যের ওপর ছাড় পেতে পারেন। ই-কমার্স, বিমা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। যেমন যদি গ্রাহকের মোবাইল সিম একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির হয় এবং তার ফলে তিন তা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট মেইনটেন্যান্স চার্জের ওপর ১০০ শতাংশ ছাড় পান, তাহলে কেমন হয়?
বর্তমানে ব্যাংক খাতে একটি ব্যবহারবান্ধব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থাকা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকরা আর ব্যাংকে গিয়ে সেবা নিতে চায় না; তারা চায় ঘরে বসে অ্যাপের মাধ্যমে সব ব্যাংকিং কার্যক্রম করতে। ফলে ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত গ্রাহক চাপ কমে এবং গ্রাহকের অনেক সময় সাশ্রয় হয়। তাই আধুনিক ব্যাংক খাতে এটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওপরে যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলা হলো, সেগুলো হয়তো সব ব্যাংককে পাওয়া যাবে না, তবে একজন ব্যাংকার হিসেবে, ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি গ্রাহককেন্দ্রিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। এটি একমাত্র উপায়, যার মাধ্যমে তারা গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে পারে এবং তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।
ব্যাংক খাতে পরিবর্তনগুলো এক বিপ্লবী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং গ্রাহক সেবায় জোর দেয়া হচ্ছে। গ্রাহকের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দ্রুত, সরল সেবা প্রদানের জন্য চাপ বাড়ছে। ব্যাংকগুলো যদি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং গ্রাহকের সঙ্গে সুসম্পর্কের দিকে মনোযোগী হয়, তারা শুধু নতুন গ্রাহক আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে না, বরং শক্ত অবস্থানও তৈরি করতে পারবে। সর্বোপরি, ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কীভাবে ব্যাংক গ্রাহক সেবা দেয় এবং তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক স্থাপন করে।
প্রিন্সিপাল অফিসার, মধুমতি ব্যাংক