মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ 

প্রকাশ: ২৩:৪৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

না.গঞ্জ থেকে বছরে ৬ মিলিয়ন ডলারের ব্রাইডাল পোশাক রপ্তানি

না.গঞ্জ থেকে বছরে ৬ মিলিয়ন ডলারের ব্রাইডাল পোশাক রপ্তানি

ছবি সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাকশিলেগু এটি এক নতুন সংযোজন। সাধারণ তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের ব্রাইডাল পোশাক তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে ‘ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড’। বিদেশের মাটিতে নারায়ণগঞ্জের তৈরি বিয়ের পোশাক বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। প্রতিবছর প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৫-৬ মিলিয়ন ডলার বিয়ের পোশাক রপ্তানি হচ্ছে। নিপুণ কারুকাজ আর দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় আদমজী ইপিজেডের একটি কারখানায় তৈরি হচ্ছে এসব উচ্চমূল্যের পোশাক, যা এখন পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের ৩৭টি দেশে। 
জার্মান বিনিয়োগে গড়ে ওঠা ‘ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড’ ২০২২ সাল থেকে আদমজী ইপিজেডে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। মূলত স্প্যানিশ ডিজাইনারদের নকশায় এখানে তৈরি হয় ওয়েডিং গাউন, ভেইল (ঘোমটা), সাটিন ও লেসের বিশেষ পোশাক এবং গহনা। কারখানা থেকে বের হওয়া প্রতিটি পোশাকে গর্বের সঙ্গে লেগে থাকে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫.২৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। চলতি অর্থবছরে তাদের লক্ষ্যমাত্রা ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ডলার। 
ইউরোপের কোনো অভিজাত বিয়ের অনুষ্ঠান। ঝলমলে আলোকসজ্জার মধ্যে ধবধবে সাদা গাউন পরে দাঁড়িয়ে আছেন কনে। পোশাকটির নকশা, কারুকাজ ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ অতিথিরা। দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, সেই রাজকীয় পোশাকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারায়ণগঞ্জের নাম। ইউরোপ, আমেরিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কনের জন্য তৈরি এমন উচ্চমূল্যের বিয়ের পোশাক এখন তৈরি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এলাকায়। সেখান থেকে এসব পোশাক রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ৩৭টি দেশে।
নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাকশিলেগু এটি এক নতুন সংযোজন। সাধারণ তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের ব্রাইডাল পোশাক তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে ‘ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড’। জার্মান বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সাল থেকে আদমজী ইপিজেডে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরে প্রায় ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন ডলারের ব্রাইডাল পোশাক রপ্তানি হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। নতুন বাজার সৃষি্ব ও উৎপাদন বাড়াতে পারলে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেডে মূলত স্প্যানিশ ডিজাইনারদের নকশা অনুসরণ করে বিয়ের পোশাক তৈরি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ওয়েডিং গাউন, ভেইল বা ঘোমটা, সাটিন ও লেসের তৈরি বিশেষ পোশাক এবং বিয়ের পোশাকের সঙ্গে ব্যবহূত বিভিন্ন ধরনের অলংকার বা গহনা। পোশাকের নকশা ও মান অনুযায়ী এতে সূক্ষ্ম কারুকাজ, লেস, অ্যাম্ব্রয়ডারি, অলংকরণ ও নিখুঁত ফিনিশিং দেওয়া হয়।
প্রতিটি পোশাক তৈরিতে একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। কাপড় নির্বাচন থেকে শুরু করে কাটিং, সেলাই, অলংকরণ ও ফিনিশিং— সব ক্ষেত্রেই বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। সাধারণ পোশাকের তুলনায় ব্রাইডাল পোশাকের কাজ অনেক বেশি সূক্ষ্ম হওয়ায় সামান্য ত্রুটিও পুরো পোশাকের সৌন্দর্য ও মানে প্রভাব ফেলতে পারে।
কারখানা থেকে বের হওয়া প্রতিটি পোশাকে থাকে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ। অর্থাৎ বিদেশের কোনো অভিজাত বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের পরনে থাকা পোশাকের সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতার পরিচয়ও পৌঁছে যাচ্ছে।
বিশেষায়িত এই পোশাক উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দক্ষ জনবল তৈরি করা। কারণ সাধারণ তৈরি পোশাক তৈরির অভিজ্ঞতা থাকলেই ব্রাইডাল পোশাকের কাজ করা সম্ভব নয়। নকশা বুঝে কাজ করা, সূক্ষ্ম সেলাই, লেস ও অলংকরণ বসানো এবং পোশাকের ফিনিশিংয়ের জন্য আলাদা ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন।
‘ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড’-এর চিফ অপারেটিং অফিসার মো. রবিউল হক সিদ্দিকী জানান, শুরুতে দক্ষ জনবল পাওয়া তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এ কারণে কর্মীদের তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করিয়ে তারপর উৎপাদন কাজে যুত্তদ্ধ করা হয়।
বর্তমানে কারখানাটিতে প্রায় সাড়ে চারশ কর্মী কাজ করছেন। তাদের একটি বড় অংশ নারী। ফলে ব্রাইডাল পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে এ খাতের বড় একটি অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে প্রচলিত পোশাকপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের বাজারে প্রবেশের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্রাইডাল পোশাক সেই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কারণ এসব পোশাকের মূল্য সাধারণ পোশাকের তুলনায় বেশি এবং নকশা ও কারিগরি দক্ষতার কারণে এতে শ্রমের মূল্য সংযোজনও বেশি। ফলে একই পরিমাণ উৎপাদন থেকে তুলনামূলক বেশি রপ্তানি আয় অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বের ৩৭টি দেশে নারায়ণগঞ্জের তৈরি ব্রাইডাল পোশাক পৌঁছে যাওয়াকে এই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। ইউরোপের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের বাজারেও এই পণ্যের চাহিদা বাড়ানো গেলে রপ্তানি বহুমুখীকরণে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম প্রধান শিলগু ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। হোসিয়ারি, নিট পোশাক, ডাইং, টেক্সটাইলসহ নানা শিল্পের পাশাপাশি আদমজী ইপিজেডে বিভিন্ন ধরনের রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তবে বিয়ের পোশাকের মতো বিশেষায়িত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ স্থানীয় শিলেগু ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
শিল্পনগরী হিসেবে নারায়ণগঞ্জের বড় সুবিধা হলো এখানে দীর্ঘদিন ধরে পোশাক তৈরির সঙ্গে যুত্তদ্ধ দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিক রয়েছে। সেই দক্ষতাকে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও উন্নত করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরিতে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু কম দামের পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে ডিজাইন, গুণগত মান, কারিগরি দক্ষতা ও মূল্য সংযোজন বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। ব্রাইডাল পোশাকের মতো বিশেষায়িত পণ্য সেই পথের একটি সম্ভাবনাময় উদাহরণ।
ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেডের চলতি অর্থবছরে ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা সেই সম্ভাবনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেড থেকে ৩৭টি দেশের বাজারে ছড়িয়ে পড়া এসব বিয়ের পোশাক এখন শুধু একটি কারখানার পণ্য নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দক্ষ পোশাকশ্রমিক, বিশেষায়িত উৎপাদন সক্ষমতা এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’-এর নতুন পরিচয়ও বহন করছে।