পুঁজিবাজারে লেনদেন ও বাজার মূলধন কমেছে
ছবি সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে গত সপ্তাহেও দরপতনের ধারা অব্যাহত ছিল। সপ্তাহজুড়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) অধিকাংশ সূচক কমেছে। পাশাপাশি কমেছে মোট লেনদেন, দৈনিক গড় লেনদেন ও বাজার মূলধন। একই সময়ে লেনদেন হওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দরও কমেছে। ফলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও লেনদেনের গতি আগের সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
গতকাল শনিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাপ্তাহিক লেনদেন পর্যালোচনায় এসব তথ্য জানা গেছে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। এর আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৩ হাজার ৮১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমেছে ৬ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা।
বাজার মূলধন কমার পাশাপাশি প্রধান সূচকগুলোতেও বড় ধরনের পতন হয়েছে। গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬৫৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে এ সূচকের অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৭৮৫ পয়েন্ট।
একই সময়ে ডিএসইর বাছাই করা ৩০টি কোম্কানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক ২৭ পয়েন্ট কমেছে। সপ্তাহ শেষে এ সূচক দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৩৪ পয়েন্টে। আগের সপ্তাহে ডিএস৩০ সূচক ছিল ২ হাজার ১৬১ পয়েন্ট।
শরিয়াহভিত্তিক কোম্কানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত ডিএসইএস সূচকও গত সপ্তাহে পতনের মুখে পড়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে সূচকটি ২৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৩২ পয়েন্টে নেমে এসেছে। আগের সপ্তাহে এ সূচকের অবস্থান ছিল ১ হাজার ১৫৫ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ২৮৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর আগের সপ্তাহে মোট লেনদেন হয়েছিল ৪ হাজার ৫২৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোট লেনদেন কমেছে ২ হাজার ২৪১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে লেনদেন কমেছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। এতে বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি স্কষ্ট হয়েছে।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে দৈনিক গড়ে ৫৭১ কোটি ৭১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। এর আগের সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৯০৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থাৎ দৈনিক গড় লেনদেনও প্রায় ৩৩৪ কোটি টাকা কমেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সূচকের ধারাবাহিক পতনের পাশাপাশি লেনদেন কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়ছে। শেয়ারদরে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে বিনিয়োগের পরিবর্তে অপেক্ষার অবস্থান নিয়েছেন। এতে বাজারে ক্রয়চাপ কমেছে এবং লেনদেনের পরিমাণও নেমে এসেছে। গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে। সপ্তাহজুড়ে মোট ৩৮৮টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে মাত্র ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে।
বিপরীতে ৩৪২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে। আর ১১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর অপরিবর্তিত ছিল।
অর্থাৎ লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের শেয়ারদর কমে যাওয়ায় বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা ছিল স্কষ্ট। দরবৃদ্ধির তুলনায় দরপতনের শিকার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ গুণ বেশি। এতে বাজারের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশেও দুর্বলতা দেখা গেছে।
খাতভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে করপোরেট বন্ড খাত লেনদেনে এগিয়ে ছিল। তবে অন্যান্য খাতের লেনদেন আগের তুলনায় পিছিয়ে ছিল।
বাজারের মোট লেনদেন কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন খাতের শেয়ার ও সিকিউরিটিজে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। সূচকের পতন এবং অধিকাংশ শেয়ারের দর কমার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে বিনিয়োগের আগ্রহও কিছুটা কমেছে।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, সায়হাম টেক্সটাইল, রানার অটোমোবাইল, ফার কেমিক্যাল, এমএল ডাইং, লাভেলো, বেক্সিমকো, ব্র্যাক ব্যাংক, পিটিএল এবং সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট।
এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি আগ্রহ দেখা গেলেও সামগ্রিক বাজারে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে। শীর্ষ লেনদেনের তালিকায় থাকা কোম্কানিগুলোর মধ্যেও শেয়ারদরের ওঠানামা ছিল।
গত সপ্তাহের বাজারচিত্রে একসঙ্গে কয়েকটি নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। প্রধান সূচকগুলোর পতন, বাজার মূলধন কমে যাওয়া, মোট লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসা এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমে যাওয়া্তসব মিলিয়ে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপের বিষয়টি স্কষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে মাত্র ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের দর বাড়ার বিপরীতে ৩৪২টি প্রতিষ্ঠানের দর কমে যাওয়ায় বাজারে বিক্রয়চাপের আধিক্য ছিল। এর সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাজারের গতিশীলতাও দুর্বল হয়েছে।
গত সপ্তাহে পুঁজিবাজারে ছিল নিম্নমুখী প্রবণতা। সূচক ও বাজার মূলধন কমার পাশাপাশি লেনদেনে বড় পতন এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা আরও বেড়েছে। বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং লেনদেনের গতি বাড়ানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।