শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

রামিসা রহমান

প্রকাশ: ২৩:৪৬, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লভ্যাংশ আটকে আফতাব অটোর পর্ষদে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা

লভ্যাংশ আটকে আফতাব অটোর পর্ষদে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা

ছবি সংগৃহীত

শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদিত লভ্যাংশ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না করায় শাস্তির মুখে পড়েছে প্রকৌশল খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে লভ্যাংশ বিতরণের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে।

সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কোম্পানিটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তিন পরিচালক, তৎকালীন প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিবকে মোট ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যক্তিগত জরিমানা করেছে বিএসইসি। একই সঙ্গে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের অবণ্টিত লভ্যাংশ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী অবণ্টিত লভ্যাংশ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যেককে প্রতিদিন আরও ১০ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত জরিমানা গুনতে হবে। সম্প্রতি বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ থেকে জারি করা আদেশে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, আফতাব অটোমোবাইলস ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) ওই লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়।

প্রচলিত সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, এজিএমে লভ্যাংশ অনুমোদনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা বিনিয়োগকারীদের কাছে বিতরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরের অনুমোদিত লভ্যাংশ ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারির মধ্যে বিনিয়োগকারীদের পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোম্পানিটি সম্পূর্ণ লভ্যাংশ পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের পাওনা অর্থ আটকে থাকে।

বিএসইসির বিবেচনায়, এটি শুধু কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার বিষয় নয়; বরং তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের প্রতি থাকা আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতারও প্রতিফলন। তাই বিষয়টি সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করেছে কমিশন।

বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মোট প্রদেয় লভ্যাংশের ৮৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের পরিশোধ করা হয়েছে। তবে বাকি লভ্যাংশ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।

কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়, অবশিষ্ট লভ্যাংশ ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেই সময়ের মধ্যেও তা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এরপর কোম্পানির পক্ষ থেকে সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়। ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও বিএসইসির কাছে কোম্পানির ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হয়নি। কমিশনের দৃষ্টিতে কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি আর্থিক সমস্যায় থাকলেও বিনিয়োগকারীদের অনুমোদিত লভ্যাংশ পরিশোধের আইনগত বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

শুধু লভ্যাংশ পরিশোধে ব্যর্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি কোম্পানিটির আইন লঙ্ঘনের ঘটনা। লভ্যাংশ বিতরণ সম্পন্ন হওয়ার পর নির্ধারিত সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও পরিপালন করেনি আফতাব অটোমোবাইলস।

বিএসইসির আদেশে বলা হয়েছে, এ ধরনের ব্যর্থতার মাধ্যমে কমিশনের ২০২১ সালের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্তি বিধিমালা এবং ডিপজিটরি প্রবিধানমালার সংশ্লিষ্ট বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে লভ্যাংশ বিতরণের তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ করা এবং তা বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ও লভ্যাংশের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় আফতাব অটোমোবাইলসের চেয়ারম্যান শফিউল ইসলামকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই পরিমাণ ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলামকে।

এ ছাড়া তিন পরিচালক—খালেদা ইসলাম, সাজেদুল ইসলাম ও ফারহানা ইসলামের প্রত্যেককে ২০ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছে কমিশন। কোম্পানিটির তৎকালীন প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) সাহাদাত হোসেন মিয়াকে ১০ লাখ টাকা এবং কোম্পানি সচিব রাহাত মাহমুদকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট সাত ব্যক্তি মিলিয়ে মোট ব্যক্তিগত জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বিএসইসি স্পষ্ট করেছে, এই জরিমানা আরোপের অর্থ এই নয় যে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের অবণ্টিত লভ্যাংশ পরিশোধের দায় থেকে মুক্তি পাবে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত জরিমানার পাশাপাশি কোম্পানিকে বিনিয়োগকারীদের পাওনা লভ্যাংশও পরিশোধ করতে হবে।

বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর আফতাব অটোমোবাইলসের ইস্যুয়ার, পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোম্পানি সচিব ও সিএফওকে কারণ দর্শানোর পাশাপাশি শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে ১৭ নভেম্বর এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে কোম্পানির পক্ষে কোম্পানি সচিব রাহাত মাহমুদ এবং সিনিয়র ডেপুটি ম্যানেজার নাফিস আহমেদ অংশ নেন।

কোম্পানির পক্ষ থেকে লভ্যাংশের একটি বড় অংশ পরিশোধের তথ্য তুলে ধরা হয় এবং বাকি অর্থ পরিশোধে সময় চাওয়া হয়। আর্থিক সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট লভ্যাংশ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি বলেও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। তবে কমিশনের কাছে এ ব্যাখ্যা সন্তোষজনক হয়নি। কারণ, লভ্যাংশ পরিশোধের জন্য আইন নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

বিএসইসি জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মালিকানায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ থাকে। ফলে কোম্পানির আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সরাসরি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

অনুমোদিত লভ্যাংশ যথাসময়ে পরিশোধ না করা এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা না দেওয়াকে কমিশন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করেছে।

বিশেষ করে লভ্যাংশ হচ্ছে কোম্পানির মুনাফা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের প্রাপ্য একটি নির্ধারিত সুবিধা। এ অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হলে বিনিয়োগকারীরা তাদের বৈধ পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। একই সঙ্গে কোম্পানির তথ্য প্রকাশ ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার ওপরও প্রশ্ন তৈরি হয়।

এ কারণে শুধু কোম্পানিকে দায়ী না করে দায়িত্বশীল পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে।

বিএসইসির আদেশে অবণ্টিত লভ্যাংশ পরিশোধের জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কমিশনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক দায় তৈরি হবে।

নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত জরিমানা দিতে হবে। ফলে কমিশনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়েছে। আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব রাহাত মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

বিএসইসি নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, অনুমোদিত লভ্যাংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের পরিশোধ করা তালিকাভুক্ত কোম্পানির দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যত্যয় হলে কমিশন বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কমিশন এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, লভ্যাংশ হলো বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য অধিকার। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি নির্ধারিত সময়ে লভ্যাংশ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে

বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে আর্থিক সংকটের কারণে লভ্যাংশ আটকে থাকলে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তাই শুধু জরিমানা নয়, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রক নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যাচ্ছে—বিনিয়োগকারীদের পাওনা এবং সিকিউরিটিজ আইনসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্সে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়ও তৈরি হতে পারে।

আফতাব অটোমোবাইলসের বিরুদ্ধে বিএসইসির এ ব্যবস্থা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ বিতরণ ও কমপ্লায়েন্সের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, লভ্যাংশ ঘোষণা ও অনুমোদনের পর সেটি যথাসময়ে বিনিয়োগকারীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া কোম্পানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি বিতরণ-সংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জকে জানানোও জরুরি।

এ ধরনের বিধান যথাযথভাবে কার্যকর না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু জরিমানা আরোপ নয়, ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলো যাতে সময়মতো লভ্যাংশ বিতরণ ও প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স সম্পন্ন করে, সে বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। আফতাব অটোমোবাইলসের ক্ষেত্রে বিএসইসির সর্বশেষ আদেশে একদিকে সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত জরিমানা করা হয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের অবণ্টিত লভ্যাংশ পরিশোধের জন্য নতুন সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন কোম্পানিটির সামনে মূল দায়িত্ব হচ্ছে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া এবং কমিশনের নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন করা।